logo

orangebd logo
বন্যা যেখানে চিরসঙ্গী : পুনর্বাসনে করণীয়
ড. মিহির কুমার রায়

ষড় ঋতুর দেশে আষাঢ়-শ্রাবণ ২ মাস বর্ষাকাল। বর্ষার ফুল কলাবতী ও কদম নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অনেক গান রচিত হয়েছে যা গানপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল আগাম বর্ষা, আগাম বসন্ত, আগাম শীত এখন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী যা আমাদের জীবন-জীবিকাকে অনেকাংশে প্রভাবান্বিত করে চলছে। এসব বর্ষা বন্যায় রূপ নিয়েছে যা বিশেষত বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মধ্যে কেন্দ্রীভূত। এ বছরের মার্চে হাওরাঞ্চল বলে খ্যাত দেশের সাতটি জেলার বিধ্বংসী আগাম বন্যা সে সব এলাকার কৃষি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তার রেশ কাটতে না কাটতেই আবার সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভী বাজারে বন্যা দেখা দিয়েছে বিশেষত অতি বৃষ্টি ও পাহাড় থেকে বাহিত হয়ে আসা ঢলের পানি। এতে করে প্রকৃতিগত ভাবে যে পানির অবস্থান থাকে তা ছেড়ে নদীগুলো প্লাবিত হয়ে জনবসতিতে প্রবেশ করেছে। এখন বন্যা কবলিত অঞ্চলগুলোতে মানুষের বসতির স্থান হলো বেড়িবাঁধ, হাইওয়ে ও সরকার পরিচালিত আশ্রয়কেন্দ্র। আবার বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ৭টি জেলা ও জামালপুরের যমুনা-তিস্তা বাহিত অঞ্চল দেখে মনে হয় প্রতিবছরই এখানে বন্যার ছোবল পড়ছে এবং নদীভাঙা মানুষের আকুতি জনজীবনকে আতঙ্কিত করে তুলছে। এর কারণ উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও বৃষ্টির পানির ব্যাপকতা। এ অবস্থা এখন ঊর্ধ্বমুখী এবং সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ড জেলায় জেলায় সিভিল সার্জন অফিস, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস, খাদ্য দফতরের অফিস, পশু সম্পদ দফতরের অফিস, কৃষি সম্প্রসারণ দফতরের অফিস সদা ব্যস্ত রয়েছে এ বন্যা পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য। এই অবস্থা দেখে মনে হয় বন্যা এসব অঞ্চলের নিত্যদিনের সঙ্গী। এর ফলশ্রুতিতে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কি যার প্রতিফলন ঘটছে সে অঞ্চলের উন্নয়ন প্রশাসনে, বাজেট, জীবন জীবিকায় ও টেকসই উন্নয়নে। সরকারের এস.ডি.জি বাস্তবায়নে অনেক অগ্রগতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শোনা যায় কিন্তু বন্যার কবলে পড়া অর্থনীতি দেশের বিশেষ অঞ্চল যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলছে প্রতি বছর তা টেকসই উন্নয়নকে অনেকাংশে পিছিয়ে দেয়ার আলামত লক্ষণীয়। এমতাবস্থায় বন্যার কারণ যে প্রকৃতিগত এবং এর উপর মানুষ কিংবা সংবিধানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি সরকারের কতটুকু হাত রয়েছে তা নিয়ে কেউ ভাবছে কি? বর্তমান বছরের বাজেটে সরকার দশটি মেগা প্রকল্পে ত্রিশ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রেখেছে যর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, পদ্ধা সেতু প্রকল্প, এলিভেটেড এঙ্প্রেস প্রকল্প ইত্যাদি অন্যতম। কিন্তু দেশের একটি বিশেষ অঞ্চলের প্রায় পনেরোটি প্রশাসনিক জেলায় কয়েক কোটি মানুষ যে প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে বন্যা কবলিত কিংবা নদী ভাঙনের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তাদের রক্ষা করার জন্য কি মেগা পদক্ষেপ রয়েছে সে প্রশ্ন অসমাপ্ত রয়েই গেল।

প্রশ্ন আসে, এ বাজেটে সরকারের অগ্রাধিকারের প্রতফিলন হয়েছে কি? প্রখ্যাত জার্মান অর্থনীতিবিদ জোসেফ সুমপেটর বহু বছর আগে বলেছিলেন শিল্পায়ন হলো একটি ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন বা সৃজনশীল ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়া যে প্রক্রিয়ায় কম সম্ভাবনাময় খাত থেকে বেশি সম্ভাবনাময় খাতে সম্পদের পুনঃবণ্টন ঘটে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হলে সাহসিকতার সঙ্গে এর অগ্রাধিকার এবং প্রয়োগ কাঠামোতে বিন্যাস আনা প্রয়োজন। এই পরিপ্রেক্ষিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা বন্যা বিমোচন কি প্রাধিকারের পর্যায় পড়ে না? আপাতত দৃষ্টিতে মনে হয় তা পড়ে না। কারণ কিছু বাঁধ নির্মাণ বা কিছু পুনর্বাসন কর্মসূচি এ ব্যাপক সমস্যার সমাধানের রক্ষা কবচ নয়। তাহলে নিরপেক্ষ বিচার বিবেচনায় দেখা যায় যে, বন্যা যেখানে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো বসে পড়েছে সেখানে স্বল্প মেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দুটি পথই অবলম্বন করে এগোতে হবে। বর্তমানে স্বল্পমেয়াদের আওতায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বাসনের যে কর্মসূচি রয়েছে সেগুলো শুধু অর্থের অপচয়ই করবে বাস্তবক্ষেত্রে কিছুই হবে না কিংবা হচ্ছে না। প্রতি বছর বন্যা আসছে এবং জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত করে চলে যাচ্ছে। তাই যে কাজগুলো করা প্রয়োজন তা হলো_ এক, বন্যা সহায়ক প্রযুক্তির উদ্ভাবন যেমন_ ভাসমান বাড়ি, ভাসমান কৃষি, ভাসমান শিক্ষা সম্প্রসারণ ইত্যাদি যা সাময়িক হলেও কিছুটা স্বস্তিকর ফল দেবে জনজীবনে, দ্বিতীয়ত, বন্যার পূর্বাভাস যা প্রস্তুতিতে সহায়ক সে ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে স্থাপন করার প্রয়োজন রয়েছে কারণ প্রস্তুতি অনেক ক্ষেত্রে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কমাবে এবং প্রাণনাশের আশঙ্কা থেকে অনেকে মুক্ত হতে পারবে। তা কি ভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাবে তার কৌশল কি? বন্যা পীড়িত অঞ্চলে যেসব স্থান উচ্চ সেগুলোকে অস্থায়ীভাবে বসতির ব্যবস্থা করতে হবে বিশেষত মানুষ, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, কৃষি সম্পদ ইত্যাদির যাকে স্থানীয় ভাবে বলা হয় বাথান। বন্যার পানি সরে না যাওয়া কিংবা নিজ গৃহে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত খাদ্য, ওষুধ, পানীয়, বাসস্থান সরকারের পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ব্যয়িত হতে পারে যা হবে সুনিয়ন্ত্রিত, সুব্যবস্থাপনায় ও দুনীতিমুক্তভাবে। আবার বন্যার পানি যতদিনই অবস্থান করুক না কেন সেই সময়টার সুষ্ঠু ব্যবহারে অর্থনৈতিক কর্মকা- বাস্তবায়ন এলাকা ভিত্তিক এনজিওদের মাধ্যমে করানো গেলে অলস সময়ের অনেকটা সদ্ব্যবহার হবে ও দেশের জিডিপিতে তার কিছুটা সংযোজন হবে; তৃতীয়ত, বন্যাদুর্গত এলাকাগুলো অনেকাংশে চর বেষ্টিত হওয়ায় যোগাযোগ একটি বড় সমস্যা তার সঙ্গে নদীভাঙন। এমন একটি জনপদে পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু রাখা খুব অনিশ্চিত হয়ে দেখা দেয়। কারণ এক বন্যায় চর ভাঙে আবার আরেক বন্যায় চর গড়ে যার ফলে জনমানুষের ঠিকানা প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হয়; পঞ্চমত, বন্যা প্রবণ প্রায় পনেরোটির বেশি জেলায় বিভাগীয়/জেলা/উপজেলা প্রশাসনকে ঢালাওভাবে সাজাতে হবে যা অন্য কোন উন্নয়ন প্রশাসনের মত নয়। কারণ ধরে নেয়া হচ্ছে ফি বছর বন্যা আসবে এবং পুনর্বাসন প্রতি বছরই করতে হবে। মিডিয়ার বদৌলতে আমরা এইগুলো দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যেমনটি দেখি রমজান কিংবা কোরবানির ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের ভিড়ে যান চলাচল রেলপথ, নৌকা, সড়কের চিত্র যা দেখতে আর ভালো লাগে না।

বন্যাকবলিত জেলাগুলোর জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সৃষ্টি করা দরকার যেখান থেকে সব সেবাগুলো সহজেই তাদের হাতে পেঁৗছে যাবে স্বল্প সময়ে এবং এর জন্য সরকারের বাজেটে তা উল্লেখ থাকতে হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, গত মার্চে হাওরে পানি প্রবেশ করল তখনই শোনা গেল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হাওর অধিদফতরের কর্মকর্তারা বিদেশ সফর করছেন। আবার শিশু বাজেটের একশ' টাকার একটিও খরচ হয় না, জেলা বাজেটের ধারণা পরীক্ষামূলক ভাবে টাঙ্গাইল জেলাতে সাফল্য লাভ করেনি। তাই আমাদের সতর্কতার সঙ্গে অতীতের ভুলগুলো সামনে রেখে আগাতে হবে; ষষ্ঠত, বন্যার সময়টি কিছুটা কষ্টের কিন্তু বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসন একটি নিয়মতান্ত্রিক বিষয় যার সঙ্গে বাসস্থান, কর্মসংস্থান, খাদ্য, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ইত্যাদি সম্পর্কিত। বন্যাদুর্গত এলাকায় যারা ধনী ব্যক্তি তারা বেশিরভাগই শহরে থাকেন এবং যারা গরিব কিংবা ধনী কৃষক তারা গ্রামেই অবস্থান বিধায় বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব তাদের বেশি পোহাতে হয়। প্রাথমিকভাবে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় লঙ্গরখানা খুলে খাবারের ব্যবস্থা অপরিহার্য। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যে গণ ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থাপনার রেকর্ড খুব আশাব্যঞ্জক নয় এবং অনেকক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে আহ্বান জানানো হয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার জন্য। ত্রান আহরণ ও ত্রাণ বিতরণে এ ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হয় কিন্তু অর্থনৈতিক কার্যক্রমে দফতরভিত্তিক কার্যক্রম প্রাধান্য পাবে যেমন কৃষি ক্ষেত্রে কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অফিস কৃষকদের মাঝে বীজ ধান, চারা, উৎপাদন উপকরণ সরবরাহে সরকারের আয়োজনে অংশ নেবে, আবার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী তারা সরকার ঘোষিত ব্যাংক ঋণ কর্মসূচির সুবিধা নেবে, আবার যারা খামারি বিশেষত দুগ্ধ কিংবা মুরগি তারা পশু সম্পদ বিভাগের সহায়তাগুলো নিয়ে তাদের ব্যবসাকে গোচাবে, তেমনি মহিলা উদ্যোক্তারা তাদের বাজার সংগঠিত করার কাজটি হাতে নেবে। ভূমিহীন হতদরিদ্র শ্রেণী তাদের পূর্বের কাজে ফিরে যাওয়ার রাস্তা খুঁজবে ইত্যাদি। এগুলোতে ইউনিয়ন থেকে উপজেলা/প্রশাসন সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। এখন প্রশ্ন হলো বন্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কি হবে যা থেকে এই সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে। আমাদের দেশের বন্যার প্রধান কারণ উজানে ভারত থেকে আশা পানি যা অনেকটা মানুষ সৃষ্টি; দ্বিতীয়টি হলো প্রকৃতি বিশেষত পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টি। এখন মানুষ সৃষ্ট সমস্যাগুলো সরকারি পর্যায়ে রাজনীতি কিংবা কূটনৈতিক পথে আগাতে হবে বিশেষত ভারতের সঙ্গে গঙ্গা চুক্তির/তিস্তা চুক্তির বাস্তবায়নের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, ভারত কিংবা চীন উজানে গঙ্গা, তিস্তা কিংবা ব্রহ্মপুত্রের ড্যাম দিয়ে যে জলবিদুৎ প্রকল্পের নামে শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখা হয আবার অতিবৃষ্টিতে তা অবমুক্ত করায় ভাটির দেশে বাংলাদেশের নদী উজাড় করে বন্যার সৃষ্টি করে। এর জন্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক, রাজনীতি, অথনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি যুক্ত রয়েছে। এখন দেশের নির্বাহী প্রধান কিংবা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কিংবা রাজনীতি কোন দিকে বিষয়টিকে নিয়ে যাবে তার ওপর নির্ভর করবে বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়। সে যাই হোক না কেন বন্যা আসবে যাবে তা যেন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী না হয়ে উঠে তার ব্যবস্থা গ্রহণ সরকারি পর্যায়ে জরুরি।

[লেখক : গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি]

mihir.city@gmail.com

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close