logo

orangebd logo
দেশের প্রকৃত করদাতা কারা?
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করার পর খোদ মন্ত্রিসভার সদস্যরাই বাজেট নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। ভ্যাট, ট্যাঙ্, ব্যাংকের আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ করার বিষয়টি নিয়ে স্বয়ং সরকারদলীয় সদস্যদের তীব্র সমালোচনার মুখে অর্থমন্ত্রী। অর্থ প্রতিমন্ত্রী উল্লেখিত বাজেটের বিষয় নিয়ে কথা বলায় অর্থমন্ত্রী ক্ষুব্ধ। তাহলে বিষয়টি কি দাঁড়ায়? বাজেটটি অর্থমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে হয়েছে? অর্থমন্ত্রী কি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বাজেটটি প্রণয়ন করেন নাই? মন্ত্রিসভার সদস্যরা কি সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পূর্বে কি বাজেট সম্পর্কিত বিষয়গুলো জানতেন না। বাজেটের ট্যাঙ্, ভ্যাট ও করারোপের বিষয়টি খোদ সরকারদলীয় মন্ত্রী সংসদ সদস্যরা যেভাবে সংক্ষুব্ধতা প্রকাশ করছেন, তাতে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা হলো সরকারের ভিতরকার অনৈক্যের। গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থায় মত পার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক? তবে মত পার্থক্য প্রকাশেরও স্তর রয়েছে। তাই স্তরভিত্তিক সমালোচনার ক্ষেত্রটি হওয়া উচিত। বর্তমান বাজেট নিয়ে যেভাবে সমালোচনা আলোচনার ঝড় উঠেছে তাতে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর একগুয়েমিতাই প্রকাশ পায়। কেবিনেট মন্ত্রীরা যখন বাজেটের নানা বিষয় নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন তা দেখে মনে হয় অর্থমন্ত্রী একক ইচ্ছায় বাজেটটি প্রণয়ন করেছেন।

ধনবাদী অর্থনৈতিক দেশগুলোতে ঠধষঁব ধফফবফ ঃধী সংক্ষেপে ঠঅঞ বা মূল্যসংযোজন করারোপ করা পদ্ধতি সরকারের বা রাষ্ট্রের আয়ের একটি উৎকৃষ্টতম পন্থা। তবে এর ফলে একই ব্যক্তিকে একটি পণ্য বা সেবার জন্য দুই বা ততোধিকবার কর দিতে হয়। বাজেটে সরকার বিদ্যুতের বিলের ওপর ভ্যাট আরোপ করেছেন। পৃথিবীব্যাপী জ্বলানি তেলের দাম কমেছে। সেই হারে বাংলাদেশে কিন্তু জ্বালানির মূল্য কমেনি। দেশের বেশিরভাগ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ফার্নেস ওয়েল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। সরকার জ্বালানির মূল্য না কমানোর কারণ হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন আগেকার ভর্তুকির বিপুল অংকের ঋণের দায় পূরণের জন্য জ্বালানি মূল্য কমানো সম্ভব নয়। এটা ছিল সরকারের জ্বালানি মূল্য না কমানোর অজুহাত, যে অজুহাত দেখিয়ে সরকার জ্বালানির মূল্য কমাননি। ওপরন্তু সরকার কয়েক দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছেন। বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি দাম বাড়ানোর বিষয়টিতে রয়েছে, উৎপাদন খরচ, প্রশাসনিক ব্যায়, কোষাগারে অর্থ যোগান, সিস্টেম লসসহ নানাবিধ ব্যয় বাড়ার কারণে ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। দাম বাড়ানোর বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় সরকার বিদ্যুৎ সংক্রান্ত ব্যায় মিটিয়ে কিছু আয় করার লক্ষ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ালেন। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যায় ও এতসংক্রান্ত খাত থেকে সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তি সাপেক্ষে ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ল, আর একজন ভোক্তা এই ইউনিট প্রতি দাম বাড়াটা মেনে নিয়ে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছে। সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদনের যাবতীয় ব্যায় মেনে নিয়ে একজন ভোক্তা বিদ্যুৎ বিল প্রদান করার পর কেন তার ওপর নতুন করে ভ্যাট আরোপ করাটা কি যুক্তিযুক্ত। বিদ্যুৎ বিলের ওপর ভ্যাট আরোপ করার সময় সরকার কি বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ সক্রান্ত বিষয়টির কোন ব্যাখ্যা দিয়ে ভ্যাট আরোপ করলেন নাকি রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ। রাজস্ব আয় ঠিক রাখার জন্যই তো বিদ্যুতের দাম বাড়ালেন। তারপর কেন বিদ্যুৎ বিলের ওপর ভ্যাটারোপ। তার একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা দরকার। রেলের টিকেট কাটতে গেলে একজন যাত্রীকে ভ্যাট দিতে হয়। কিছু দিন আগে রেলের ব্যয় বেড়েছে। এই ভাড়া বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, রেলের নানাবিধ ব্যয় ও প্রশাসনিক খরচ মেটানোর জন্য রেলের ভাড়া দ্বিগুণ করা হলো। সরকারের রেলের ভাড়ার বাড়ানোর বিষয়টি মেনে নিয়ে একজন যাত্রী টিকেট কেটে রেল ভ্রমণ করছে তারপরও কেন আবার তাকে ভ্যাট দিতে হয়। রেলের ব্যয় সংক্রান্ত বিষয়গুলোর নিরিখে যদি ভ্যাট আরোপ করা হয়ে থাকে তাহলে তার বিশ্লেষণ জনগণকে জানানো দরকার। কয়েক দফায় দফায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করেছে সরকার, আর গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর সময় বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তারপর গ্যাস বিলের ওপর ভ্যাটারোপ করাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত হয়েছে।

ধরা যাক, একজন ভোক্তা একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব কিনলেন। এক্ষেত্রে বিক্রেতা বাল্বটির ওপর আরোপিত ভ্যাট হিসাব করে মূল্য নির্ধারণ করে ভোক্তার কাছে বাল্বটি বিক্রি করেন। বাল্বটির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরকারকে করপোরেট ট্যাঙ্ প্রদান করে। দেখা যায়, বাল্বটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তার করপোরেট ট্যাঙ্, প্রশাসনিক খরচ, কাঁচামাল ক্রয়, মেশিনারিজের অপচয় এবং বাল্বটি উৎপাদনের জন্য যবতীয় খরচ যোগ করে বাল্ব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাল্বটির পাইকারি মূল্য নির্ধারণ করেন। পাইকারি ভাবে বাল্বটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে কিনে খুচরা বিক্রেতা ভ্যাটারোপ করে পুনঃমূল্য নির্ধারণ করে ভোক্তার কাছে বিক্রি করে। এই প্রক্রিয়ায় বিষয়টি কি দাঁড়ায়? উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ট্যাঙ্টাও ভোক্তা প্রদান করল আবার খুচরা বিক্রেতার ভ্যাটও ভোক্তাকে দিতে হলো। এর ফলে দেখা যায় যে, একজন বাল্ব ভোক্তাকে দুইবার ট্যাঙ্ দিতে হচ্ছে। অর্থনীতির নিয়মানুসারে যখন কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর কর আরোপ করা হয় তখন সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান করের আপাতত ভার বহন করে থাকে। কিন্তু করের প্রকৃত আর্থিক ভার সে বহন করে না বা বহন করতে পারেও না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, সরকার যদি কাপড়ের ওপর কর ধার্য করেন তাহলে বিক্রেতারা কাপড়ের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং এই কর ক্রেতাকেই বহন করতে হয়। অর্থনীতির ভাষায় সরকার যার ওপর প্রথম কর ধার্য করে তখন সেই ব্যবস্থাকে করাঘাত বলা হয় এবং যেই ব্যক্তিকে এই কর বহন করতে হয় অর্থাৎ যিনি কর প্রদান করেন সেই ব্যবস্থাকে করপাত বলে। স্বাধীনতার ৪৬ বছরের বিভিন্ন সময়ের ধার্য করা করের করপাতটি নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তকেই বহন করতে হয়েছে। অর্থনীতির নিয়মানুযায়ী কর নির্ধারণের সরকারে উদ্যেশ্য হলো ১. রাষ্ট্রের ব্যায় নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা, ২. জনসাধারণকে সঞ্চয় ও বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, ৩. অবাঞ্চিত পণ্যের উৎপাদন ও ভোগ নিয়ন্ত্রন করা, ৪. সামাজিকভাবে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি করা, ৫. মূল্যস্ফীতি রোধ করা ও মূল্য স্থিতিশীলতা রাখা, ৬. অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করা এবং আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। ২০১৭-২০১৮ সালের বাজেটের কর নির্ধারন পদ্ধতির আলোকে উল্লেখিত বিষয়গুলো নিরীক্ষণ করলে দেখা যায়, শুধু সরকার ১নং বিষয়টি অজর্নের চেষ্টায় লিপ্ত। জনসাধারন ব্যাংকে সঞ্চয় ও শেয়ার বাজারে অর্থ বিনিয়োগের উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। ২০১০ সালে এদেশের ক্যাপিটাল মার্কেট (শেয়ার বাজার) এ বিনিয়োগকারীরা মূলধন হারিয়ে পথে বসেন যার জন্য দেশের ক্যাপিটাল মাকের্ট এ বিনিয়োগ দিন দিন কমছে। অপরদিকে মানি মাকের্ট (ব্যাংক ব্যবস্থা) সরকারের বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের করারোপের ফলে ধীরে ধীরে রুগ্ণ হয়ে পড়ছে তাছাড়া এক লাখ কোটি টাকা ঋণ খেলাপির ফলে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গুলিতে দেখা দিচ্ছে ক্যাশ ফ্লোর স্থবিরতা। নানা প্রকারের করারোপের ফলে সাধারণ আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখতে চান না। একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্য মতে দেখা যায়, দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবৃদ্ধি দিন দিন কমছে, ২০১২ সালে দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ২০ শতাংশ, ২০১৩ সালে ১৫.৯৯ শতাংশ, ২০১৪ সালে ১৩.৪৫ শতাংশ, ২০১৫ সালে ১৩.০৮ শতাংশ, ২০১৬ সালে ১২.৭৮ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৬ শতাংশ। সরকারের তথ্য মতে দেশের মানুষের আয় বাড়ছে অর্থাৎ মানুষের হাতে টাকা আছে। ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধির গতির নিম্নমুখিতার জন্য প্রশ্ন আসে, তাহলে এই টাকা মানুষ ব্যাংকে না রেখে কোথায় রাখছে? অবাঞ্ছিত পণ্যের ওপর সরকার করারোপ করছে, যেমন সিগারেট বা তামাক জাতীয় পণ্য এর ওপর। তবে তামাক উৎপাদনে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করার জন্য কার্যকরি কোন পদক্ষেপ নাই। যথাযথ মাধ্যমে দেশে সামাজিক খাতে অর্থ প্রবাহটা দিন দিন কমেছে। মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল ও রোধ করার একমাত্র উপায় হিসাবে কাজ করেছে খাদ্যপণ্য বর্তমানে তার মূল্যও উর্ধ্বগতি ফলে মূল্যস্ফীতিটাও স্থিতিশীল আর থাকবে না। ভ্যাট ও ট্যাঙ্ারোপের ফলে ধনী দরিদ্র বৈষম্য দিন দিন প্রকট হতে প্রকটতর হয়ে উঠছে, মাথাপিছু আয়ের বিষয়টি নিরীক্ষণ করলে বৈষমের ছবিটা স্পষ্ট বোঝা যাবে।

বাংলাদেশের কর কাঠামোতে প্রত্যক্ষ কর আদায়ের অংশটা খুবাই কম। একমাত্র ভূমি রাজস্ব ও মুষ্টিমেয় কয়েকটা খাত ছাড়া সব খাতেই পরোক্ষ কর আদায় হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কর কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট করের ৬৪ শতাংশ, কানাডার ৬৬ শতাংশ, সুইডেনের ৪৫ শতাংশ, মিয়ানমারের ৫০ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৪৬ শতাংশ প্রত্যক্ষ কর হিসাবে কর কাঠামোতে আদায় করা হয়। অপরদিকে বাংলাদেশে মাত্র ১৫-২০ শতাংশ কর কর কাঠামোতে প্রত্যক্ষ কর হিসাবে বিবেচিত। বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় ৮০-৮৫ শতাংশ কর পরোক্ষ ভাবে আদায় করা হয়। সরকার বাজেটের সময় বিভিন্ন পণ্য বা সেবার ওপর যে করারোপ করে তা অর্থনীতির ভাষায় করাঘাত বলা হয় আর এই করাঘাত করপাতে পরিণত হয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বর্তায়। ফলে এদেশের ধনী শিল্পপতিদের কোন কর দিতে হয় না। দেশের ধনী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের ওপর কর ঘাত করে ঠিকই কিন্তু সেই করটা তারা করপাতে পরিণত করে ভোক্তাদের কাছ থেকে আদায় করে সরকারের কোষাগারে জমা দেয়। আর এভাবেই একেকজন ধনী মানুষ সরকারের শ্রেষ্ঠ করদাতা হিসাবে বিবেচিত হয়ে সিআইপি মর্যাদা ভোগ করেন। যার ফলে দিন দিন ক্রমাগতহারে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বেড়েই চলছে। দেশের বিদ্যমান কর কাঠামোটির কারণে একই পণ্যের ওপর ভোক্তাকে দুইবার বা ততোধিকবার ট্যাঙ্ দিতে হচ্ছে।

বিদ্যমান কর কাঠামোর কবলে পড়ে পরোক্ষভাবে কর দিয়ে দেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন ধারণ ওষ্ঠাগত। তাই একই মুরগিকে বার বার জবাই না করে বিদ্যমান কর কাঠামোর পরিবর্তন করে কর আদায়ের ব্যবস্থা করা দরকার।

[লেখক: কলামিস্ট]

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close