logo

orangebd logo
বাজেট নিয়ে আরও কিছু কথা
অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

১ জুন তারিখে সংসদে বাজেট উপস্থাপিত হচ্ছে। নির্বাচন আসন্ন বলে এবারের বাজেট জনবান্ধব হতে পারে বলে মনে করছি। অনেকেই বলছেন এ বাজেট জনবান্ধব, ব্যবসা বান্ধব, উন্নয়ন বান্ধব হবে। 'জনে'র সংজ্ঞায় যদি কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কথা ধরি তাহলে এখনও প্রশ্ন থাকবে বাজেটটা কতটা জনবান্ধব হবে। বাজেট প্রস্তাবে অর্থায়ন নিয়ে বহু কথা হচ্ছে এবং হবে। বাজেটের ৪০ ভাগ অর্থ জোগান দিতে আয়কর, সম্পূরক কর ও ভ্যাটের ভূমিকা নিয়ে এত বেশি আলোচনা হয়েছে যে অন্য বিষয়ে আলোচনার তেমন সুযোগ মেলেনি। প্রথমেই আয়করের কথা বলা যায়। আয়করের ভিত্তি সম্প্রসারণের সুযোগ পর্যাপ্ত। এমন কিছু পেশাজীবী আছেন যাদের আয়ের যথাযথ নিরীক্ষা ও তার উপর কর নির্ধারিত হলে সাধারণ মানুষের করমুক্ত আয় সীমা বাড়িয়েও এনবিআর এর পক্ষে ব্যাপক অর্থ জোগান সম্ভব। তারপর সম্পূরক করের কথা বলা যায়। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ মোতাবেক সম্পূরক কর ক্ষেত্রভেদে কমবে ও ক্ষেত্রভেদে তুলে দেয়া হবে। তাতে সাধারণ ভোক্তাদের তাৎক্ষণিক লাভবান হবার সম্ভাবনা আছে। কোন কোন পণ্যের উপর সম্পূরক কর তুলে দেয়া হলে তা চূড়ান্ত বিচারে দেশের মঙ্গল বয়ে আনবে কিনা তাও দেখতে হবে। কারণ তাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লোকসানের উপক্রম হতে পারে এবং বিদেশি পণ্য স্থায়ী আসন গেড়ে বসবে। সব ক্ষেত্রে একই হারে অর্থাৎ ১৫% ভ্যাট ধার্য করে আবাসন খাতে নাভিশ্বাস তোলার ব্যবস্থা হবে কিনা তাও বিবেচ্য।

বাজেটের আকার ধার্য করা হয়েছে ৪ লাখ ২৫০ হাজার কোটি টাকা; যার ৪০ শতাংশ আসবে আয়কর ও ভ্যাট থেকে যার পরিমান হবে ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা কিংবা ২ লাখ ৪৮ কোটি টাকার। ভ্যাট আদায়ের বিদ্যমান কৌশল নিষ্ঠার সঙ্গে বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত বিশাল অংক চলে আসবে। এখন দেশে নিবন্ধিত ভ্যাট দাতার সংখ্যা ৬ লাখ ৬৪ হাজার হলেও ভ্যাট দেয় মাত্র ৩২,২০০ প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে ৪টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভ্যাট অনাদায় আছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। এই দৃশ্যটি মনে রেখে ৭৮০০ কোটি টাকা পাওয়ার প্রত্যাশায় আইএমএফ বা বিশ্ব ব্যাংকের নির্দেশ কিংবা মোড়লীপনা কতটা মেনে নেয়া সংগত হবে। সরকারি ব্যাংকিং খাতটাকে ৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত যেখানে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক জালিয়াতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকিং আইনে সংস্কার এনে ব্যাংক উদ্যেক্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি কতটা যুক্তিসঙ্গত? ব্যাংক লুটের ব্যাপারে শুধু ব্যাংক কর্মচারী ও সন্দেহভাজন ঋণ গ্রহীতার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকের পর্ষদ পর্যায়ের দায় দায়িত্ব উদঘাটন জরুরি। এমন অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে দিনের পর দিন ভর্তুকি দেয়া কতটা সমীচীন সে কথাও জিজ্ঞাস করা যায়।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট চিন্তার যে পরিবর্তন এসেছে তাতে সবাই ভেবেছিল এবারে শিক্ষা খাতে ডিডিপির ২০ শতাংশ বা বাজেটে ৬ শতাংশ চিহ্নিত হবে এবং তারপরই যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়াদির অগ্রাধিকার ক্রম পরিবর্তিত হবে। বাস্তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে তেমন কোন পরিবর্তন আসবে না। বিদেশে স্কুল শিক্ষক এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষকের বেতন-ভাতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের চেয়ে বেশি। এটা অবশ্য আমাদের সমাজ ব্যবস্থা বা মন-মানসিকতায় নাও হতে পারে, কিন্তু তাই বলে শিক্ষকদের বঞ্চিত রেখে মান সম্পন্ন শিক্ষার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থাকবে। মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ১৬ বিলিয়ন ডলার আসছে তার কতকাংশ আবার মূলে ফেরত যাবে তা দেখার বিষয়।

সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন ভাতা প্রদান ও বৃদ্ধির প্রস্তাব এই বাজেটে নাও থাকতে পারে। এই ব্যাপারে গঠিত কমিশনের মতামতের ভিত্তিতে এ বছর না হলেও আগামী বছরের কোন এক সময়ে সরকারি কর্মচারীগণ তাদের কাঙ্ক্ষিত মুদ্রাস্ফীতি রোধক বেতন বৃদ্ধি পেয়ে যাবেন। বর্তমানে তারা যে বেতন- ভাতাদি পাচ্ছেন তাতে ধারণা করা হয়েছিল যে তাদের দক্ষতা বাড়বে এবং দুর্নীতি বহুলাংশে কমবে। পত্র-পত্রিকায় যখন বেগম পাড়ার কথা বার বার আসছে, তখন দুর্নীতির ব্যাপারে সাধারণ মানুষ আঙ্গুল তুলছে। তারা সংগঠিত নয় বলেই তাদের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে না। তবে আগামী বছরান্তে তারা ব্যালট বাঙ্রে সামনে দাঁড়িয়ে দুর্নীতি কিংবা ক্ষেত্রভেদে নেতাকর্মীর দাম্ভিকতার জবাব দিয়ে দিতে পারে। দক্ষতার ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্য নেই কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নে যে ৯৩ শতাংশ থেকে ৭৮ শতাংশে নেমেছে তাও অস্বীকার করার জো নেই। এ বছরের উন্নয়ন বাজেট যে মাত্র ৫২ ভাগ ব্যয়িত হয়েছে তাও জানা কথা। এই সময়ে রাস্তাঘাট খোঁড়া খুঁড়ির মহোৎসব বৃদ্ধি পায় আর মানুষের মনে এই বোধ জাগিয়ে দেয় যে এখন লুটপাটের মৌসুম। এ বোধ যে কি বিপজ্জনক হবে তার ভাবনা শুধু একজনই ভাবছেন, অন্যরা কতটা ভাবছেন তা প্রশ্নবোধক। একজন মানুষ তার জীবন বাজি রেখে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন আর তার বিপরীতে নিজ দলের হাজার হাজার মানুষ ক্রমাগত পিছনে টেনে ধরবে। অথচ তারা সবাই বহিরাগত। এসব আগাছাগণ এমন শক্তিশালী হচ্ছে যে তার রাষ্ট্রের আদেশ নির্দেশকেও তোয়াক্কা করছে না এবং ক্ষেত্রভেদে অভাবনীয় ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন।

এতসব কিছুর পরে বাজেটে যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির কথা বলা হয়েছে তার প্রশংসা যোগ্য। পত্রিকার খবরে প্রকাশ যে হাওরের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দরিদ্র, বিধবা নারী, সচ্ছল-অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা, দরিদ্র মা, বয়স্ক নাগরিকসহ সকল উপকার ভোগীকে একই প্লাটফর্মে আনা হবে। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে আরও প্রায় ৭ লাখ জনগোষ্ঠীকে উপকারভোগীর আওতায় আনা হচ্ছে। টাকার অংকে বৃদ্ধির পরিমাণ ১০০ থেকে ২০০ টাকা ও সংখ্যা বিচারে বৃদ্ধির পরিমাণ ১০% থেকে ২০%। বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও হিজড়াসহ বিভিন্ন খাতে সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষা বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া বেদে ও অনগ্রসর শ্রেণীর ভাতা বাড়ানোসহ লিভার ও সিরোসিস রোগীর বরাদ্দ, শ্রমিক ও কর্মজীবী স্তন্যদায়ী মায়েদের সুবিধা বৃদ্ধি হচ্ছে। আয়কর দাতাদের ভিত্তিটা সম্প্রসারিত করা গেলে কিংবা অধিকসংখ্যক প্রতিষ্ঠান প্রচলিত হারে ভ্যাটের আওতায় আনা গেলে বর্তমানে প্রচলিত আয়করের ব্যাপক নিম্নগামী পরিবর্তন আনা সম্ভব। আয়কর ও অনাদায়ী ভ্যাটের জন্য এডিআর প্রবর্তন করা যেতে পারে। ভ্যাটের ভিত্তি সম্প্রসারণ ও অংক বৃদ্ধির জন্য ইলেকট্রিক ক্যাশ মেসিন বিতরণে পরিবর্তন বাঞ্ছনীয়। ইলেকট্রিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার কেন ৫০ হাজার রেজিস্ট্রিকৃত ভ্যাট দাতাকে ক্রয় মূল্যে সরবরাহ করা হবে। সবার জন্য অর্থাৎ ৬.৬৪ লাখ ভ্যাট দাতার জন্য এই ইলেকট্রিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার ক্রয় ও ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এতে দুর্নীতি কমবে ও ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। ১৫ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১২ লাখ লোক আয়কর দিচ্ছে। আর হাজার হাজার মানুষ ৫০ হাজার টাকার টিকেট কিনে বিদেশি সাংস্কৃতিক কর্মীদের অনুষ্ঠান দেখছে। এমন অসঙ্গতি সমাজে ভঙ্গুর প্রবণতা জন্ম দেবে।

আমার শেষ কথা হচ্ছে নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্প্রসারণ, শুল্ক ও ভ্যাটে কোনরূপ পরিবর্তন অবাঞ্ছিত। ভ্যাটের প্রভাব সমাজের প্রতিটি মানুষের উপর পড়ছে ও পড়বে। তবে স্বল্প আয়ের ও স্থির আয়ের মানুষের কথাটা ভাবা সঙ্গত হবে। এরা অসংগঠিত বলেই কোন কালেই প্রভাবশালী হবে না তা ভাবা বাতুলতা মাত্র। তারা তো নীরব বিপ্লব ঘটাতে সমর্থ। সেসব কথা মনে রেখে নিরাপত্তা বেষ্টনীর আকার-আকৃতি পরিবর্তন সময়োপযোগী হচ্ছে। তবে সকল খাতে একই হারে ভ্যাট আরোপ এখন ঠেকিয়ে রাখা ভালো। ভূমি রেজিস্ট্রেশনে আকস্মিক পরিবর্তনে সুফল আসবে না। দুর্নীতি দমনে কঠোরতম পদক্ষেপ সুফল দেবে বলেই ধারণা করছি।

[লেখক : শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা]

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close