logo

ঢাকা, শুক্রবার ৫ ফাল্গুন, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

orangebd logo
সাগর-রুনি হত্যা : বিচারের আশা কি ছেড়ে দিতে হবে?
সীমান্ত প্রধান

আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও গণমাধ্যম_ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মূলত এই চারটি স্তম্ভের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এই চারটি স্তম্ভের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এর মধ্যে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। ব্যক্তি মানুষ থেকে সামষ্টিক মানুষ তথা এক কণ্ঠ থেকে লক্ষ-কোটি কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয় এই মাধ্যম থেকে।

রাষ্ট্রের অন্য তিনটি স্তম্ভ থেকে মানুষ যখন ন্যায় বঞ্চিত হয়_ তখন 'চতুর্থ স্তম্ভ'ই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের অন্যতম হাতিয়ার। অর্থাৎ 'চতুর্থ স্তম্ভ' বলহীনের বল, আশ্রয়হীনের আশ্রয় হয়ে উঠে। রাষ্ট্রশক্তি, অপরাধী, অন্যায়কারী_ বরাবরই একে ভয় পায়। এ মাধ্যমে যারা কর্মরত, তারা দায়িত্বসহকারে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অনিয়ম, অসঙ্গতি তুলে এনে দেশবাসীকে জানাচ্ছে। স্বাধীন মতপ্রকাশ করতে গিয়ে কখনো কখনো সে মানুষটি নিজেই নৃশংস হত্যার শিকার হচ্ছে, খবর হয়ে যাচ্ছে পত্রিকার পাতায়!

নির্বাচনকালীন সময় থেকে শুরু করে দেশের যে কোন দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে গণমাধ্যম এমন এক ধরনের স্তম্ভ হিসেবে কার্যকরভাবে সক্রিয় থাকে, যেখানে অসৎ উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলোর অবয়ব বাধা পড়ে এই ফ্রেমে। এমনকি জাতীয়, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন ও নিরাপত্তায় সক্রিয় ভূমিকায় রাষ্ট্রে চতুর্থ স্তম্ভের ভূমিকা যুগযুগ ধরেই স্বীকৃত।

আম-জনতাকে কোনো ইস্যুতে একটি 'বিন্দু'তে আনতে গণমাধ্যমের ভূমিকা তুলনা করে শেষ করা যাবে না। কোন দাবি-দাওয়া ঘিরে কেন্দ্রীয় শহরে জনসমাগম তৈরিতে বা তৃণমুল পর্যায়ে আন্দোলন দাঁড় করাতে বা কোন তহবিল গঠন করতেও গণমাধ্যম অনন্য ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়; রাষ্ট্রের অন্য তিনটি স্তম্ভেরও 'ওয়াচডগ' হিসেবে চতুর্থ স্তম্ভ ভূমিকা রাখে। এছাড়া যে কোনো পাবলিক এজেন্ডাকে সরকারের এজন্ডাতে পরিণত করতে অনন্য এক ভূমিকা পালন করে গণমাধ্যম। এছাড়া যে কোনো সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হত্যা, ধর্ষণ, দখল, অপরাজনীতি, দুঃশাসন, অনাচার, অবিচার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপনীতি, গাফলতিসহ সমাজের নানা অসঙ্গতির কথা উঠে আসে এ মাধ্যমে।

এমনকি সরকারের নেয়া অবিবেচনাপ্রসূত যে কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে গণমাধ্যম যে ভূমিকা পালন করে, তা বলা বাহুল্য। পাশাপাশি নানা অনিয়মের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার ক্ষেত্রেও গণমাধ্যম অনন্য। পাশাপাশি রাষ্ট্রের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনাকে জনসম্মুখে তুলে ধরে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকার জুড়ি মেলা ভার। যার ফলে গণমাধ্যমের ওপর নানামুখী চাপ আসে প্রতি মুহূর্তে। এ কারণে এ পেশা যে কোন পেশার চেয়েও অত্যাধিক ঝুঁকিপূর্ণ। গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকিসহ খুনের শিকারও হচ্ছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও সাংবাদিকতা পেশাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করছে আজকের অনেক তরুণ-তরুণীরা। তবে হতাশাজনক ব্যাপার হলো, এ পেশায় নিয়োজিত থাকা অবস্থায় স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে যতজন সংবাদকর্মী খুন হয়েছেন, তার একটির বিচারও সম্পন্ন করতে পারেনি আমাদের রাষ্ট্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাগর-রুনি দম্পতি। দেশের আলোচিত এই হত্যাকা-ের রহস্যজট ৫ বছরেও উন্মোচিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যার কারণে এই হত্যাকা-ে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

রাজন-রা?কিব হত্যার বিচার ৭ মা?সের ম?ধ্যে এবং নারায়ণগঞ্জের ৭ খু?নের বিচার ৩ বছরেরও কমসময়ে তথা ৩৮ কার্য?দিব?সের মধ্যে সম্পন্ন করা হলো। সরকারের কঠোর মনোভাব, আন্তরিকতায় এসব হত্যার তদন্ত শেষ হয়েছে, বিচার পেয়েছে স্বজনেরা। কিন্তু ৫ বছর পূর্ণ হলেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকা-ের বিচার তো দূরের কথা, এখনো পর্যন্ত এ মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি রাষ্ট্র। কবে নাগাদ, তদন্ত শেষ হবে, বিচার পাবে তাদের একমাত্র সন্তান মেঘ, রাষ্ট্রের কাছে সঠিক কোন উত্তর আছে কী? নাকি তিমিরেই থেকে যাবে এ হত্যা রহস্য! তবে এ হত্যা রহস্য উদঘাটনসহ বিচার সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সরকার কী আন্তরিক নন?

সাগর-রুনি হত্যাকা-ে সরকারের নির্লিপ্ততাই বলে দিচ্ছে, রাষ্ট্রই চাচ্ছে না এ হত্যা রহস্য উদঘাটনসহ তদন্ত শেষ হয়ে শুরু হোক বিচার প্রক্রিয়া। তা না হলে এ সরকারের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী করে বলতে পারেন, 'এ মামলার তদন্তে অগ্রগতি সম্পর্কে আমার জানা নেই'! একটি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি এমন একটি চাঞ্চল্যকর মামলার শেষ খবরটুকু না জানেন, তাহলে অনুমান করে এটুকু বলতে পারি_ সাগর-রুনি হত্যা বিচারে সরকার আন্তরিক নন। তারা আন্তরিক হলে এ হত্যার রহস্যজট আরও আগেই খুলে যেত। বিচারের আশা কী তাহলে ছেড়েই দিতে হবে?

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি দম্পতি খুন হন রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসায়।এ হত্যাকা-ের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সারাহ খাতুন বলেছিলেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। কিন্তু; সেই ৪৮ ঘণ্টা তো দূরের কথা, দীর্ঘ ৫ বছরেও এ হত্যাকা-ের রহস্যজট খুলতে পারেনি রাষ্ট্র, যা সাংবাদিক সমাজকে দারুণভাবে হতাশ করেছে। অথচ এ হত্যার বিচারের পাশাপাশি এর নেপথ্য কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। কেননা এ শুধু নিছক হত্যাকা-ই নয়, এর পেছনে অনেক বড় কোন কারণ থাকতে পারে। শুধু তাই নয়; এ হত্যার নেপথ্যে অনেক রাঘব বোয়ালজড়িত থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এ হত্যাকা-ের পর রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। প্রথম দিকে এর তদন্তভার পড়েছিল এই থানা পুলিশের ওপর। তারপর সে দায়িত্ব দেয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি)। গোয়েন্দা পুলিশ তাদের তদন্ত শেষ করতে না পারায় আদালতে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে। এ অবস্থায় আদালতের নির্দেশে তদন্তভার দেয়া হয় এলিট ফোর্সকে (র‌্যাব)। কিন্তু দীর্ঘ ৫ বছরেও সেই তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য ৫ বছরে আদালতের কাছে ৪৬ বার সময় চেয়েছে র‌্যাব। আদালতও তা মঞ্জুর করে। সবশেষ আদালত তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য আগামী ২১ মার্চ সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তবে, আদালতের বেঁধে দেয়া এই সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়বে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তারপরও আমরা আশা রাখি, রাষ্ট্র আমাদের নিরাশ করবে না। সাগর-রুনি হত্যা রহস্যজট উন্মোচনসহ খুনিদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করবে। আমরা আশা করি, এ হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে, যাতে দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সমুন্নত থাকে। আমরা আশা করবো তদন্তের নামে র‌্যাব যেন কালক্ষেপণ না করে। আদালতের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে র‌্যাব এ হত্যা রহস্যজট উন্মোচনসহ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। এর মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। এটুকু আশা রাষ্ট্রের কাছে আমরা রাখতেই পারি। আমরা রাষ্ট্রের কাছে প্রার্থনা করব, ছোট্ট মেঘ যেন বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বাবা-মা হত্যার বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়।

[লেখক: কবি ও সাংবাদিক]

simantaprodhan05@gmail.com

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.