logo

orangebd logo
মহাদেব সাহা
প্রেম ও রাজনীতির হৃদয়ভাষ্যের কবি
ফারহানা রহমান

মহাদেব সাহার কবিতা যতই পড়ছি ততই মনে হচ্ছে কবি যেন এক সীমাহীন অন্ধকারের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে কবি যেন দেখতে পান সূর্যাস্তের রঙে অাঁধারের প্রতিটি আস্তরণ, যেখানে আমাদের অনুভূতির নীল দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকে। কুহেলি মাঠের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে অবিনাশী জীবনের আলোক সম্ভাবনার ইঙ্গিতও পাই সেখানে। নিজের সৃষ্ট এক স্বতন্ত্র কবিতার ভুবনে যিনি ধ্যানমগ্ন হয়ে গত চার দশক ধরে সৃষ্টি করে চলেছেন একের পর এক হৃদয়স্পর্শী, অশ্রুসজল বিধুর চিত্রময় প্রেমের পঙ্ক্তি। রাজনীতির ধারাভাষ্য। মহাদেব সাহা, ষাটের দশকের একজন প্রধান ও খ্যাতিমান কবি। পাঠকের চোখে দিকে তার দৃষ্টি-নির্লিপ্ত, উদাসীন, কখনো বিষণ্ন ও অভিমানী, কখনো হাস্যোজ্জ্বল, কিন্তু সর্বদাই ভালোবাসায় নত। অসামান্য সাবলীলতায় তিনি সংবেদনশীল মনের প্রকৃত রূপটি তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়। মানুষের শুভবোধ, মানবিকতা, প্রেম, বেদনা, নিঃসঙ্গতার হাহাকার, জাতীয়তাবোধ ও সমাজতন্ত্রের প্রতি বিশেষ ঝোঁক, তাঁর কবিতার মুল বিষয়আশয়। আবেগের স্বতঃস্ফূর্ততা ও প্রেম-প্রকাশের সরলতায় ও মননশীলতায় তিনি কাব্যরচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। সহজিয়া প্রেমাবেগের সঙ্গে সমকালীন সামাজিক রাজনৈতিক প্রসঙ্গকে তিনি অনিবার্য সত্যের মতোই কাব্যরূপ দিয়েছেন। তাঁর কবিতায় যেমন মূর্ত হয়ে উঠেছে আমাদের এই চিরপরিচিত জীবন, এই প্রকৃতি, চরাচর_ তেমনি উন্মোচিত হয়েছে এক অজানা রহস্যের জগৎ। তাঁর কবিতা, আশ্চর্য কোমল ও গীতল স্বতঃস্ফূর্ত, চিত্রময়, হৃদয়স্পর্শী।উল্লেখ্য, ষাটের দশকের পূর্বেই বাংলাদেশের কবিতা বিষয় ও শিল্পমূল্যের বিচারে এক অভূতপূর্ব স্বয়ংসম্পন্নতা অর্জন করে, ফলে এই সময়ে এসে কবিতায় নতুন এক ধরনের আন্দোলন সৃষ্টি করা ছিল অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। ষাটের কাব্যান্দোলনের অন্তরালে যে রুগ্নতা পরিলক্ষিত হয়, তাও এই সময়ে কবিদেরকে যেমন প্রভাবিত করে, তেমনি কবিতা হয়ে ওঠারও অন্তরায় বলে বিবেচিত হয়েছে। ষাটের সাহিত্যধারাকে যিনি ভিন্নতর করে তুলবার বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন, সেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই দশকের মধ্যে লক্ষ করেছিলেন একধরনের অন্তঃসারশূন্যতা, ক্রন্দন, অনিকেত চেতনা, নাগরিকতা, রাজনীতি বিচ্ছিন্নতা। তবে ওই দশকের শেষে এসব থেকে সরে এসে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের পচন ক্লেদ ও নৈঃসঙ্গ্যকে তারা অগ্রাহ্য করতে পারেননি। সেই বিচ্ছিন্ন পৃথিবীতে দেশ-জাতির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলে লেখক-কবিদের নন্দনভাবনায় প্রাধান্য পেয়েছিল অবক্ষয়ী রুগ্নতা ও ব্যক্তিসর্বস্বতা। রাজনীতি থেকে দূরে সরে আসে। এই জন্মান্ধ ও জন্মেই কুঁকড়ে যাওয়া স্বপ্নের বাস্তবতার মুখোমুখি আত্মরতিপ্রবণ মধ্যবিত্তের জীবনচক্রে ঘূর্ণায়মাণ কাব্যলোক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন কবিরা। এটিও ছিল ওই সময়ের কবিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। একইসাথে এই দশকের শেষ দিকে এসে আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন তীব্র হলে আর ঊনসত্তরের গণআন্দোলন শুরু হলে ষাটের কবিরা জাতীয়তাবাদী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।কবি মহাদেব সাহার জন্ম বৃহত্তর পাবনা জেলার ধানঘড়া গ্রামে? পিতা গদাধর সাহা, মাতা বিরাজমোহিনী? পিতামাতার একমাত্র সন্তান তিনি। ১৯৭৩ সালে ঢাকায় দেখা হয় কুমিল্লার মেয়ে নীলা সাহার সাথে। বার দুয়েকের দেখাশোনায় নিজেদের একটু জানাশোনাও হয়। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজেদের পছন্দে দুজন বিয়ে করে ফেলেন। তাঁদের দুই পুত্রসন্তান তীর্থ সাহা ও সৌধ সাহা। তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু কালীতলা প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৬১ সালে ধুনট হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন। কিছুদিন পর টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে ফিরে যান বগুড়ায় এবং সেখানেই ভর্তি হন কলেজে। সেই সময় শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতি চর্চার ভীষণ অনুকূল পরিবেশ ছিল বগুড়ায়। ফলে কবি মহাদেব সাহা তুমুলভাবে সেখানে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। শহরের বুকে 'বেনীপুর বুক হাউজ' ছিল সকল সাহিত্যমোদীদের প্রিয় ঠিকানা। ওই সময়েই তিনি এবং আরও কিছু আধুনিক প্রগতিশীল তরুণ মিলে বের করেন লিটল ম্যাগাজিন 'বিপ্রতীক'। একইসময় তিনি আকৃষ্ট হন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের পত্রিকা 'কণ্ঠস্বর'-এর। নিজ জীবন দর্শনের প্রতিফলন তিনি দেখতে পান এই পত্রিকায়। 'কণ্ঠস্বর' পত্রিকার সেস্নাগান ছিল, যারা সাহিত্যের স্বনিষ্ঠ প্রেমিক, যারা শিল্প উন্মোচিত, সৎ, অকপট, রক্তাক্ত, শব্দতাড়িত, যন্ত্রণাকাতর, যারা উন্মাদ, অপচয়ী, বিকারগ্রস্ত, অসন্তুষ্ট, বিবরবাসী, যারা তরুণ, প্রতিভাবান, অপ্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধাশীল, অনুপ্রাণিত, যারা পঙ্গু, অহংকারী, যৌনতাপিষ্ট_ 'কণ্ঠস্বর' তাদেরই পত্রিকা। এরই মধ্যে ডাক আসে স্বাধীনতার। দেশ এগুতে থাকে স্বাধীনতার যুদ্ধের দিকে। ইতিমধ্যে তিনি ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রকৃতপক্ষেই সাহিত্যের তীর্থভূমি। কবিতা লিখে মহাদেব সাহা সর্বস্তরের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন। একইসময়ে ঢাকার অনেক পত্রিকাতেও নিয়মিত ছাপা হতে থাকে তাঁর কবিতা। '৬৯-র জুন মাসে কণ্ঠস্বর সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ উদ্যোগ নেন তরুণ কবি-লেখকদের নিয়ে প্রথম সাহিত্য উৎসব করার। এই সম্মেলনে একটি প্রবন্ধ পড়ার জন্য মহাদেব সাহাকে তিনি অনুরোধ করেন। ঢাকায় এসে তিনি ওঠেন আবু সায়ীদেরই গ্রীন রোডের ছোট্ট দুই রুমের বাসায়। সম্মেলনে নতুন লেখকদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হল আর প্রবন্ধ পড়ে পেলেন যথেষ্ট প্রশংসা। এরপরই গভীর অনুরাগ আর ভালোবাসার শহর রাজশাহী ছেড়ে, প্রমত্তা পদ্মা ছেড়ে চিরতরে পাড়ি জমান ঢাকায়। এ প্রসঙ্গে কবি মহাদেব সাহা বলেছেন_ "গার্ড বাঁশি বাজালেন। পেছনে পড়ে রইল রাজশাহী, মতিহার, কাজলা, উন্মুক্ত উত্তাল পদ্মা, আমি তাকিয়ে আছি অনন্তের দিকে। আর সঙ্গে নিয়ে চলেছি বহু আনন্দ-বেদনা, ভালবাসার স্মৃতি। সবার জীবনে যেমন আমার জীবনেও তেমনি সেই উদ্দীপ্ত-মুখর দিবারাত্রির কলধ্বনি নীরবে বহে চলেছিল মনে। আমি রাজশাহী ছেড়ে ঢাকা যাচ্ছি, সে ছিলো অতল জলের আহ্বান, কবিতাময় দিনরাত্রির স্বপ্ন।"১৯৬৯-এর জুলাই মাসে দৈনিক 'পূর্বদেশ'-এ সহকারী সম্পাদক পদে যোগদান করেন মহাদেব সাহা। ১৯৭৮ থেকে '৮৪ পর্যন্ত কাজ করেন সংবাদ পত্রিকায়। এরপর ১৯৮০ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী ৩০ বছর একনিষ্ঠভাবে কাজ করে গেছেন ইত্তেফাক পত্রিকায়। সাহিত্যের পালাবদলে বাংলা কবিতার শ্বাশত রূপটিকে মহাদেব সাহা স্বমহিমায় শৈল্পিকভাবে তুলে ধরেছেন তাঁর ৫৯টি কাব্যগ্রন্থে। এই প্রধান কবি গ্রন্থাগারে প্রথম সূচিবদ্ধ হন ১৯৭২ সালে 'এই গৃহ এই সন্ন্যাস' কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে। কবিতা ছাড়াও লিখেছেন শিশু-কিশোরদের জন্য কবিতা, ভ্রমণ কাহিনী, আত্মজীবনী, সমালোচনাসহ নানা ধরনের রচনা। সব মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৮১। তবে কবি হিসেবেই তাঁর যত খ্যাতি।কবি মহাদেব সাহার কবিতার প্রধান প্রবণতা হচ্ছে রাজনীতি ও প্রেম। ব্যর্থতা ও বিষাদ, নৈঃসঙ্গ্য ও একাকিত্ব, তীব্র জীবনাসক্তি ও বেদনাবিধূর জগতের বিদীর্ণ বেলাভূমিতে কবি ভালোবাসার জন্য সবসময় উম্মুখ হয়ে থাকেন। মর্মস্পর্শী সুখ-দুঃখ গাথার এক অবিরাম উপাখ্যান হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতা। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, রাজনৈতিক মনস্কতা তাকে টেনে আনে মাটি আর মানুষের খুব কাছাকাছি। তাঁর কবিতার শব্দনির্বাচন, ধ্বনিময়তা, চিত্রকল্প সবকিছুই যেন মৌমাছির মতো গুঞ্জরণ তোলে মানব মনে : ভালোবাসা তুমি এমনি সুদূর স্বপ্নের চে'ও দূরে/ সুনীল সাগরে তোমাকে পাবে না আকাশে ক্লান্ত উড়ে/ ভালোবাসা তুমি এমনি উধাও এমনি অগোচর/ তোমার ঠিকানা মানচিত্রের উড়ন্ত ডাকঘর। অন্য একটি কবিতায় দেখি, তুমি যখন আমার কাছে ছিলে/ তখন গাছের কাছে গেলে আমার ভীষণ আনন্দ বোধ হতো/ তুমি না থাকলে বড়ো দুঃসময় যায়, সর্বত্র বন্ধুবিহীনভাবে বাস করি/ এই ঢাকা শহর ভীষণ রুক্ষ মনে হয়/ নিজেকেই নিজের কাছে অজানা লাগে/ মনে হয় দীর্ঘদিন থেকে আমি যেন কোনো অজ্ঞাত অসুখে ভুগছি।তবে মহাদেব সাহার কবিতার কেন্দ্রীয় বিষয় মানুষ। মানুষের শুভবোধ, শুভচেতনার প্রতি আস্থা, মানুষের সার্বিক মুক্তির কথা তিনি ভেবেছেন আর তুলে ধরেছেন তাঁর কাব্যে। মানুষের কল্যাণচিন্তা, মানবিকতা, বিপন্ন মানুষের মুক্তির কথা তিনি বারবার তুলে এনেছেন তাঁর কবিতায়। আত্মমুখি ও উল্লম্বধর্মী চেতনার জগৎ থেকে কবিতার ক্ষেত্রকে তিনি প্রসারিত করেছেন জীবনের আনুভূমিক রেখার দিকে। তিনি ভেবেছেন সমাজতন্ত্র মানুষের প্রকৃত মুক্তি আনতে পারে। তাকে কষ্ট দিয়েছে মানুষের নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতাকে তিনি সর্বতভাবে ঘৃণা করেন, বিরোধিতা করেছেন যুদ্ধের ও সামপ্রদায়িকতার। একি বৈরী যুগে এসে দাঁড়ালাম আমরা সকলে/ সূর্য নিয়ত ঢাকা চিররাহুগ্রাসে, মানবিক প্রশান্ত বাতাস এখন বয় না কোনোখানে/ শুধু সর্বত্র বেড়ায় নেচে কবন্ধ-দানব। অন্য একটি কবিতায় দেখি, "বড়ো ত্রাস, সদর দরজা ভেঙে/ যেন হুহু করে মধ্যরাতে ঢুকে পড়ে সন্ত্রাসের ট্রাক/ অকস্মাৎ ভেঙে দেয় নিসর্গের রম্য খেলা/ জ্যোৎস্নাময় এ রাত্রি, কাঁঠালিচাঁপার বন/ বনচারী পাখিদের শান্ত ঘুম/ অবকাশ/ ত্রাস/ শুধু ত্রাস।" লেলিন, এই নামটি উচ্চারিত হলে/ রমাঞ্চিত হয়ে ওঠে প্রাণ/ দেখি ভল্গা থেকে নেমে আসে মানবিক উৎসধারা আমাদের বঙ্গোপসাগরে।মহাদেব সাহার বহুমাত্রিক সাহিত্যকর্ম তাঁর কবিতার নান্দনিকতা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একদিকে তিনি প্রেমিক, রমণপ্রিয়, নারীর সৌন্দর্য ও শরীরের প্রতি আগ্রহী। আবার অন্যদিকে সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ছিলেন যথেষ্ট সচেতন এক মানুষ। প্রেম ও রমণীর সানি্নধ্য_ আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও তিনি সামাজিক-রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে নিজেকে কখনই আড়াল করতে চাননি। তাই তিনি যখন দেখতে পান স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার আগেই স্বপ্নগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে শুরু হয়েছে স্বাধীন বাংলার পিছন দিকে পথ হাঁটা, তিনি মুষড়ে পড়েন। তিনি দেখেন বাকস্বাধীনতার মানে বন্দুকের নলের উপর বুক ঠেকিয়ে রাখা। সেই সময় দেশ ও জাতির গভীর ক্রান্তিকালে মহাদেব সাহার কবিতায় তখন উচ্চারিত হয় দ্রোহ আর প্রতিবাদ। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তখন কবিতা প্রকাশ করেন 'সংবাদ', 'সমকাল'সহ বিভিন্ন পত্রিকায়। "তাহলে কি গোলাপেরও দেশপ্রেম নেই/ যদি সে সবারে দেয় ঘ্রাণ / কারো কথা মতো যদি সে কেবল আর নাই ফোটে রাজকীয় ভাসে / বরং মাটির কাছে ফোটে এ অভিমানী ফুল / তাহলে কি তারও দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ উঠবে চারদিকে?আপাত সরল অথচ জীবনঘনিষ্ঠ বোধের মাধ্যমে বাংলা কবিতায় এক অনন্য সম্মোহনের জগত বিনির্মাণ করেছেন কবি মহাদেব সাহা। তাঁর কবিতায় রয়েছে একদিকে আবেগ, ব্যক্তিকশূন্যতা, সংকট, বিরহকাতরতা ও প্রকৃতিচেতনা। আবার অন্যদিকে শব্দের ভেতরের শব্দ, কবিতার ভেতরের কবিতাকে অনায়াসে তুলে আনার কারণে তাঁর কবিতা যেমন স্বতন্ত্র তেমনি নান্দনিক। গভীর জীবনবোধ-জারিত তাঁর প্রতিটি কবিতা তাই সঙ্গত কারণেই যেমন মানুষের মননকে ধারণ করে; তেমনিভাবে রাজনৈতিক-সামাজিক অনুষঙ্গকেও নিজস্ব বিষয়ে পরিণত করতে পেরেছেন তিনি।মহাদেব সাহা আসলে আমাদের সেই প্রাণিত প্রাতিস্বিক কবি যিনি এইসময়ের বিশুষ্ক ও বিশীর্ণ কাব্যধারায় ফিরিয়ে এনেছেন বসন্তকাল, নবজীবন, নবশৈলীপ্রবাহ। বাংলা কবিতার শাশ্বত আবেগময় রূপটিকে তুলে ধরে কবিতাকে করেছেন সজীব, হৃদয়গ্রাহী ও জনপ্রিয়। তিনি পাঠক সৃষ্টি করেছেন, পাঠককে ফিরিয়ে এনেছেন কবিতায়। তাঁর কবিতা তাঁর নিজের সৃষ্ট এক স্বতন্ত্র ভুবন_ যেখানে তিনি নিজেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল কবি হিসেবে নিজেকে উন্মোচিত করেছেন পাঠকের কাছে। এই ধ্যানমগ্ন, ব্যথিত, বিভোর কবি মোহময়ী ভাষায় রচনা করেছেন আমাদের নিবিড় জীবনভাষ্য। তাঁর কবিতাতেই স্পষ্ট করে বলে গেছেন নিজের গোপন কথা। এ প্রসঙ্গে আমার জীবনী কবিতায় লিখেছেন, "আমার জীবনী আমি লিখে রেখে যাব/ মাটির অন্তরে, ধুলোর পাতায় / লিখে রেখে যাবো মেঘের হৃদয়ে / বৃষ্টির ফোঁটায়/ হাঁসের নরম পায়ে/ হরিণশিশুর মায়াময় চোখে/ ফুলের নিবিড় পাপড়িতে আমি লিখে রেখে যাবো / আমার জীবনী / লিখে রেখে যাবো বৃক্ষের বুকের মধ্যে / পাহাড়ী ঝর্নার ওষ্ঠে / সবুজ শস্যের নগ্নদেহে।"মহাদেব সাহা, পরিশেষে বলা যায়, সেই কবি যাঁর কাছে কবিতা হয়ে উঠেছিল আত্মজীবনীর শৈল্পিক ভাষ্য। রাজনীতি, প্রেম, আত্মপ্রসঙ্গ, নাগরিক নির্বেদ তাঁর কবিতায় সংবেদনশীলিত ভাষায় তাই উপজীব্য হয়েছে। বাংলাদেশের কবিতায় ষাটের এই কবির স্থান তাই অনন্য হয়েই থাকবে নিঃসন্দেহে।পাঁচ আগস্ট কবির ৭৪তম জন্মদিন। এই দিনে তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close