logo

orangebd logo
ইউনাইটেড স্টেটস অব লাবু
আশরাফ জুয়েল

'একটা ইঁদুরের লেজ, এক টাকা।'মদুল স্যার বলেছিল। ফলশ্রুতিতে ব্যাপক ধরপাকড় চলল। মা'র ঘরের কাঠের বাঙ্রে পেছন, বৈঠকে চৌকির তলা, হেঁসেলে চাল রাখার হাঁড়ি_ অসম্ভব পরিশ্রম। সাকল্যে তিনটা ইঁদুর মারা পড়েছিল।নিম্নবিত্তের সংসারে আয় করতে শেখাটা কত যে জরুরি, লাবু তা অল্প বয়সেই বুঝে গেছিল, ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেছিল মা। লাবুর আব্বা সাত ছেলেমেয়ের পিতা, রিটায়ারের দ্বারপ্রান্তে কোঁকাতে থাকা একজন সরকারি কেরানী। 'এক বেলা খাওয়া' এই অমোচনীয় সংবিধান দ্বারাই চলছিল লাবুদের পরিবার।ক্লাস থ্রিতে পড়াকালীন সময়কার কথা; ইঁদুরের লেজ বেচে আয় করা হরিণ অাঁকা এক টাকার তিনটা নোট খুব যত্ন সহকারে বাম হাতের তালুতে শক্ত করে অাঁকড়ে রেখেছিল লাবু। সন্তর্পণে হাফপ্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বাড়ি এসেছিল। একবারের জন্যও বাম হাতটা পকেট ছাড়া করেনি সে, যেন পুরো পৃথিবী তার হাতের মুঠোয় বন্দি। টাকা তিনটা এনে মায়ের হাতে দিয়েছিল লাবু। মা টাকাটা নেয় নি।উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় ইঁদুর নিধনের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র প্রতিটা ইঁদুরের লেজের দাম ধার্য করেছিলো এক টাকা। আয় করতে শেখার আনন্দের চেয়ে ইঁদুরগুলোকে মারার আনন্দকেই অনেক বেশি উত্তেজনাকর বলে মনে হয়েছিল লাবুর। লাবুর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠেছিল।এর কিছুদিন পরেই মেজ'পা_ লাবুর সম্পর্কের কাকা, কাউসারের সাথে পালিয়ে গেছিল, তখন থেকেই মেজ'পা তাদের সংসারের সংবিধান থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া আরেকটি উপধারার নাম। এমন আরও বেশ কিছু অলঙ্ঘ্যনীয় ধারা-উপধারা আছে লাবুদের পারিবারিক সংবিধানে।চলিত কাল মেনে যে বছর গড়িয়ে যাচ্ছে তার এপ্রিল মাসের এক তারিখ খালঘাট সংলগ্ন রামজানপুর গাঁয়ে একটা কুয়াশা-গন্ধী ঘটনা ঘটে গেলো। ঘটনাটা ঘটল গাঁয়ের পঞ্চদশ বর্ষীয়া প্রায় কিশোরী প্রায় তরুণী সাবিহার সাথে। সাবিহা, লাবুদের পারিবারিক সংবিধানের আরেক উপধারা। গ্রামের মানুষজন বলছে, এটা আত্মহত্যা। সাবিহা বলছে, সে ভরা বন্যার মহানন্দায় ঝাঁপ দেয়নি। চেয়ারম্যান বলছে, তার ছোট ব্যাটা ঢাকা গেছে। সাবিহা বারবার গলা উঁচিয়ে বলছে, সে আত্মহত্যা করেনি। চেয়ারম্যান ততোধিক উঁচু গলায় বলছে, তার ছোট ব্যাটা বাড়িতেই নেই। চেয়ারম্যানের গলা যেহেতু অনেক বেশি উঁচু, তাই শেষ পর্যন্ত চেয়ারম্যানের উঁচু গলার কথাই টিকে থাকলো। সাবিহার অভিমানী লাশ সাঁতার কাটতে কাটতে বালিয়াডাঙ্গা পর্যন্ত চলে গেছিল। খবর পেয়ে লাবু দৌড়াতে দৌড়াতে সাবিহা বু'র সাথে দেখা করতে গিয়েছিলো। ইঁদুর মারার পর থেকে লাবুর ভয়ডর বর্ষার চাপ কলের পানির মতো হয়ে গেছে। নদীর পাড়ে গিয়ে লাবু দেখলো, সাবিহা বুবু মহানন্দার উত্তাল স্রোতের চাদরে চিত হয়ে শুয়ে আছে, আষাঢ়ের ভরা নদী একটু বাতাসেই দুলে দুলে উঠছে, সেই সাথে সাবিহা বুবুও দুলে উঠছে। সাবিহা বুবু নিশ্চিন্ত মনে শুয়ে আছে, আকাশ তার খুব প্রিয়, সে আকাশ দেখছে। লাবুরও খুব ইচ্ছা হয় সাবিহা বুবুর সাথে স্রোতের চাদরে শুয়ে থাকতে। কিন্তু সে রকম কিছু হয় না। হুমায়ন কাকা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাবিহা বুবুর শরীরকে ধরে টানতে টানতে তাকে নদী পাড়ে নিয়ে আসে। স্রোতের চাদরে ঘুমাতে থাকা সাবিহা বুবু'কে ওঠানো হলো। ততক্ষণে সাবিহা বু'র চোখ দুটো ফাঁস জাল দিয়ে ধরা কাতলা মাছের মতন ঘোলাটে হয়ে গেছে।'বু, তুই ভ্যাস্যা গেলি কেনে?' ভ্যানের উপর টান টান হয়ে শুয়ে থাকা সাবিহাকে জিজ্ঞেস করে লাবু। মহানন্দা নদীর বেয়াড়া স্রোতে ভাসতে ভাসতে মনে হয় সাবিহা বুবুর অনেক তৃষ্ণা পেয়েছিলো, বুবুর পেটটা ফুলে লাবুদের পোষা পোয়াতি গরুটার মতো হয়ে গেছে।'তুই তো হ্যাঁর সোঁতে সাতরিয়া পারতিস ন্যা। তাহিলে কিভাবে কহছিস হামি ভ্যাস্যা গেছি? হ্যাঁ, ভ্যাস্যাই গেছি, ঐ ভ্যাস্যা যাওয়ার মানে তুই বুঝবি ন্যা।''বুবু, তোর চোখ দুটা ঘোল্যাট্যা হোয়্যা গেছে?' ভ্যানের এক প্রান্তে বসে লাবু কথা বলছিল ফেঁপে ওঠা মৃত সাবিহা বু'র সাথে।'চেয়ারম্যানের ব্যাটা কুণ্ঠে গেছে রে? জানিস?' মৃত সাবিহার ঘোলাটে চোখ আরও ঘোলাটে হয়ে উঠে, আজকের সূর্য যেন তাড়ি খাওয়া মাতাল, সাবিহা বুবু রোদের তাপে গলতে শুরু করেছে নাকি?'ঢ্যাক্যা দে, মুখে রোইদ লাগছে।' ভ্যান চালাতে চালাতে চেঁচিয়ে বলে হুমায়ন কাকা। হুমায়ন কাকার শরীর এতক্ষণ ভেজা ছিলো নদীর পানিতে এখন ভিজে যাচ্ছে ঘামে আর অশ্রুতে।'কেনে রে বুবু। চেয়ারম্যানের ব্যাটাকে দিয়া কি করবি! চেয়ারম্যান চিলি্লয়্যা চিলি্লয়্যা কহছিলো ওর ব্যাটা নাকি ঢাকা গেছে।'লাবু অবাক হয়ে তাকায় বুবু'র রোদ পড়া চকচকে মুখের দিকে। এ সময়ে বুবু'র তো মা'র কথা, আব্বার কথা জিজ্ঞেস করা উচিৎ ছিলো। কিন্তু বুবু চেয়ারম্যানের ব্যাটার কথা কেন জিজ্ঞাসা করছে? হুমায়ুন কাকা চিল্লাচিলি্লতে বুবু'র মুখ লাল চাদর দিয়ে ঢেকে দেয় লাবু। বুবু'কে প্রশ্নটা করা হয়ে ওঠে না। মনের ভেতর প্রশ্নটা লাট্টুর মতো ঘুরতে থাকে, ঘুরতে ঘুরতে এক সময় টাল খেয়ে ঢলে পড়ে। বালিয়াডাঙ্গা থেকে খালঘাট পর্যন্ত দূরত্বকে 'একটা জীবনের সমান' মনে হয় লাবুর। হুমায়ন কাকা সৎ শ্রমে ও শোকে ভ্যান টানছে। কাকার মুখ দেখতে পাচ্ছে না লাবু কিন্তু আব্বার মুখ দেখতে পাচ্ছে। সাইকেলের প্যাডেল ঠেলতে ঠেলতে ভ্যানের পেছন পেছন আসছেন আব্বা। লাবুর আব্বা, সরকারি অফিসের কেরানী, জনাব আলী, মৃত মেয়ের দেখানো পথে বাড়ির দিকে ফিরে যাচ্ছেন। গরিব কেরানীরা কি বৃদ্ধ হবার পূর্বেই বৃদ্ধ হয়ে যায়? তা না হলে আব্বা এতো দ্রুত বুড়িয়ে হয়ে যাচ্ছে কেন? আব্বার চোখে মুখে শোকের লেশমাত্র দেখা যাচ্ছে না, বরং পরিশ্রমের বলিরেখাগুলো তরতাজা হয়ে উঠছে। সাবিহার বরফ হাত ধরে ভ্যানে বসে বসে এসব ভাবছে লাবু। তার চার নম্বর ডিয়ার মার্কা ফুটবল সাইজের মাথায় কিছু ঢুকছে না আজ। ইটের সোলিং করা আধা ভাঙ্গা রাস্তায় ভ্যান চলতে গিয়ে বুবু'র শরীর মাঝে মাঝে কথা বলে উঠছে।'ক্যাইল থ্যাক্যা চেয়ারম্যানের ব্যাটাকে দেখ্যাছিলি লাবু?' একটু আনমনা হয়ে গেছিলো সে। সংবিৎ ফিরে পেয়ে বুবু'র হাতটা আরও শক্ত করে ধরে লাবু। চেয়ারম্যানের নাম, 'শামসু ব্রিঙ্' দিয়ে সোলিং করা এবড়োখেবড়ো ইটের রাস্তার ঝাঁকুনিতে বুবু'র মুখ থেকে বারবার লাল কাপড়টা সরে যাচ্ছে। তখন বুবু'র মুখটা দেখতে ঠিক ঐ তিনটা ইঁদুরের মতো লাগছে।'চেয়ারম্যান কহছিলো ওর ব্যাটা নাকি ঢাকা গেছে। তুই এ কথা পুঁছ করছিস কেনে কহাতো বুবু?'মৃত মানুষ যে এভাবে কথা বলতে পারে, তা ভাবতেও পারেনি লাবু। তার ধারণা_ শুধু মৃত ইঁদুর কথা বলতে পারে, যেমন বলেছিলো ঐ ইঁদুর তিনটা, সামান্য তিনটা লেজের জন্য জীবন হারানো ইঁদুর তিনটা। লাবু ইঁদুর তিনটাকে কবর দিয়েছিলো_ একা একা। কবর দেয়ার পূর্বে লাবুর সঙ্গে ইঁদুরগুলো অনেক কথা বলেছিল। ইঁদুর তিনটা বারবার লাবুকে জিজ্ঞেস করছিল, 'লাবু, রাষ্ট্রের কথা শুন্যা হারাকে ম্যার্যা ফেল্ল্যা?' ইঁদুর না হয় একটা লেজের জন্য রাষ্ট্রের কারসাজিতে জীবন দিয়েছিলো? বুবু? বুবুকে কিসের জন্য জীবন দিতে হল? বুবুর তো লেজ ছিলো না? তাহলে কি বুবুর অন্য কিছু ছিলো? যার জন্য বুবুকেও জীবন দিতে হল? ভাবলে মানুষ বড় হয়_ লাবুও বড় হয়ে উঠছে। আশ্চর্য, আজকের মাতাল সূর্যটাও তো আব্বার মতন সাবিহা বুবুর সাথে সাথে ভ্যানের চাকায় জড়িয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে খালঘাট সংলগ্ন রামজানপুরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আজ লাবুদের বাড়িতে উপচে পড়া ভিড় থাকবে, যেমন ছিলো মেজ'পা হারিয়ে যাবার দিন।'তুই ঢাকা য্যাতে পারবি ভাই? হামার ল্যাগ্যা, মেজ'পার ল্যাগ্যা?' ঢুলতে ঢুলতে হুমায়ন কাকার ভ্যান রামজানপুরে ঢোকার কিছু সময় পূর্বে সাবিহা বুবু শেষবারের মতো কথা বলে উঠলো । বুবু'র ঘোলাটে দৃষ্টি আরও ঘোলাটে হতে হতে একদম সাপে কাটা মানুষের মতো অন্ধকার হয়ে গেল। লাবু দেখল সূর্যটাও খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আব্বাও কি তাহলে এভাবে ফুরিয়ে যাবে? দ্রুতই।কিছুদিনের মধ্যে পরপর কয়েকটি মৃত্যু লাবুদের পরিবারকে দেখে নিলো।প্রথমে ইঁদুর তিনটা, তারপর সাবিহা বুবু, শেষে আব্বা। অথচ আব্বা, বুবু বা ইঁদুর তিনটা, কারুরই মরার বয়স হয়েছিলো বলে মনে হয়নি লাবুর। রাষ্ট্র একটা ইঁদুরের লেজের দাম ধার্য করেছিলো এক টাকা। কিন্তু আব্বা বা বুবু'র কোন দামই ছিলো না রাষ্ট্রের কাছে, যেহেতু তাদের দাম ছিলো না, তাই তাদের হত্যাকারী কে সেটা বের করার তাগিদও নেই রাষ্ট্রের।ইদানীং লাবু এই সব আবোল তাবোল ভাবে, ভাবনাগুলোকে পোষ মানানোর চেষ্টা করে। সত্যিকার অর্থে লাবু ভাবনাগুলোকে ইঁদুর মেরে পাওয়া তিন টাকার মতো শক্ত করে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু ভাবনাগুলো দ্রুত গলতে থাকা সস্তা বরফের মতো আঙুলের ফাঁক দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে এক ফোঁটা দুই ফোঁটা করে মাটিতে পড়ে মিলিয়ে যায়। মেজ'পা পালিয়ে যাবার সময় লাবু কিছু বলেনি। মৃত সাবিহা বুবু বারবার চেয়ারম্যানের ব্যাটাকে খুঁজেছে। রাষ্ট্রের চাকর আব্বা, তিরিশ বছর ধরে ধীরে ধীরে খুন হয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রের সেবা করতে করতে। আব্বা মরে যাওয়াতে রাষ্ট্রের কিছুই এসে যায়নি, কিন্তু লাবুদের পরিবারের মুখ বন্ধ হয়ে গেছিলো। তাদের পরিবারের 'এক বেলা খাওয়ার' সংবিধান আরও কিছু ধারা হারিয়ে অধিকতর দুর্বল হয়ে পড়ে। লাবুদের 'পরিবার রাষ্ট্রের' সংবিধান রহিত হলো।লাবুর খুব ইচ্ছা একবারের জন্য হলেও 'রাষ্ট্র' হয়ে দেখবার। যদি সে কোনদিন 'রাষ্ট্র' হতে পারে তাহলে সে চায় তার নাম হোক_ 'ইউনাইটেড স্টেটস অব লাবু'

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close