logo

orangebd logo
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ
সৈয়দ মুজতবা আলীর চেতনায়, মননে
দেবাহুতি চক্রবর্তী

বাংলাদেশের শ্রীহট্ট, অধুনা সিলেট জেলার সন্তান সৈয়দ মুজতবা আলী। ১৯২১-১৯২৬ অবধি সরাসরি রবীন্দ্রনাথের সানি্নধ্যে শান্তিনিকেতনের ছাত্র। পরবর্তী সারাজীবন রবীন্দ্রনাথের ভাবশিস্য হিসেবে জীবন পার করেছেন। শান্তিনিকেতনে তখনকার শিক্ষার্থীরা সবাই কমবেশি শিল্পের কোন না কোন শাখায় পারদর্শী হওয়ার সাধনায় ব্যস্ত এবং ব্যগ্র ছিলেন। নিজে সেখানে 'গাঁইয়া লোক' হিসেবে প্রবেশ করেছেন এবং স্মৃতিচারণে বলেছেন_ 'আমার বাপ-পিতামোর চোদ্দপুরুষ কেউ' কখনও গাওন-বাজনার ছায়া মাড়ানো দূরে থাক, দূর থেকে ঝঙ্কার শুনলেই রামদা নিয়ে গাওয়াইয়ার দিকে হানা দিয়েছে। আমরা কট্টর মুসলমান। কুরআনে না হোক আমাদের স্মৃতিশাস্ত্রে গাওন-বাজনা বারন, বাঁদরওয়ালার ডুগডুগি শুনলে আমাদের প্রাচিত্তির করতে হয়। আমার ঠাকুরদাদার বাবা নাকি সেতারের তার দিয়ে সেতারিকে ফাঁসি দিয়ে শহীদ হয়েছিলেন।"এমন পরিবেশ পিছে রেখে শান্তিনিকেতনের পাঁচ বছর তার জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। এবং বহু ভাষাবিদ হিসেবে, শাস্ত্রজ্ঞ হিসেবে, বিদগ্ধ প-িত হিসেবে, পরিব্রাজক হিসেবে, রম্যরচনাকার হিসেবে, সাহিত্যিক হিসেবে সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য আসনের দাবিদার।রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সানি্নধ্যে আজীবন অবগাহন করা এই মানুষটি কবির বিপুল ব্যক্তিত্বের গৌরব এবং মহিমা পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করেছেন। ব্যক্তিগত নৈকট্য এতটাই ছিল যে তার মনে হয়েছে_ "রবীন্দ্রনাথের ঘরের দেয়াল, আসবাব তাঁকে আমার চেয়ে ঢের বেশি দেখেছে।" আর রবীন্দ্র সাহিত্যের ভাবের গভীরতা এবং চিন্তার ঐশ্বর্য এবং জীবন বৈচিত্র্য দ্বারা সৈয়দ মুজতবা আলী এতটাই প্রভাবান্বিত যে বারবার তিনি বলেছেন, "এ আমি নিশ্চয় করে জানি যে, আমার মনোজগৎ রবীন্দ্রনাথের গড়া।"রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সুযোগ পেলেই তিনি স্বতঃস্ফূর্ত হয়েছেন। সংশয় ছিল এই বিরাট ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভাকে তার পক্ষে সঠিকভাবে প্রকাশ হয়তো সম্ভব নয়। "রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কিছু লিখতে আমার বড় সংকোচ বোধ হয়। ভয় হয়, যত ভেবেচিন্তেই লিখি না কেন, বিদগ্ধজনেরা পড়ে বলবেন, দীর্ঘ পাঁচ বছর রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষালাভ করেও এই ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্বের যথার্থ পরিচয় পেল না। এই অভিমত যে নিদারুণ সত্য তা আমি জানি তাই স্থির করেছিলুম যে কয়েক বৎসর রবীন্দ্রনাথকে যে তার প্রাত্যহিক জীবনে সহজ সরলভাবে পেয়েছিলুম সেকথা একেবারেই অপ্রকাশিত রাখব।" পরবর্তীতে মনে হয়েছে, "একথা তো ভুলতে পারিনে যে, একদিন তার চরণপ্রান্তে বসে আশীর্বাদ লাভ করেছি, তার অজস্র অকৃপণ দাক্ষিণ্যে ধন্য হয়েছি। সেই অপরিমেয় স্নেহের ঋণ অপরিশোধ্য" তবু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথের মূর্তিটি নির্মাণকরে যাওয়ার দায়ভার থেকেই কিছু কিছু স্মৃতিচারণ করেছেন। তার সবটা তুলে ধরা এখানে সম্ভব নয়।সৈয়দ মুজতবা আলী যখন শান্তিনিকেতনে যান তখন শিক্ষকম-লীর মধ্যে 'চিত্রে নন্দলাল। সংগীতে দীনেন্দ্রনাথ। শাস্ত্রে বিধুশেখর। শব্দতত্ত্বে হরিচরণ। শিক্ষকতায় জগদানন্দ। রসে ক্ষিতিমোহন।' এরা প্রত্যেকেই আপন আপন ভুবনে স্ব-আলোকিত। রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি আর বাংলা সাহিত্য পড়াতেন।" ব্যাপকার্থে রবীন্দ্রনাথ তাবৎ বাঙালির গুরু। কিন্তু তিনি আমাদের গুরু শব্দার্থে। এবং সে গুরুর মহিমা দেখে আমরা সবাই স্তম্ভিত হয়েছি। শান্তিনিকেতন ছাড়ার পর বার্লিন, প্যারিস, কায়রো, লন্ডন প্রভৃতি স্থানে বহু গুরুর সানি্নধ্যে সৈয়দ মুজতবা আলী এসেছেন। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে বাংলা সাহিত্য তো বটেই, শেলী কীটস, বায়রন, ওয়ার্ডসওয়ার্থকে তিনি যেভাবে পড়াতেন তাতে ঐসব কাব্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হতো। শ্রেণীকক্ষে রবীন্দ্রনাথের পাঠদান এর কোনো রেকর্ড বা অনুরূপ লিখন সম্ভব হয়নি। কিন্তু পড়ানোর সময় যে ইন্দ্রজালের সৃষ্টি হতো তা স্বর্গীয়। "হায়, এ বর্ণনা যদি কেউ লিখে রাখত তাহলে বাঙালিতো তার রস পেতই, বিলেতের লোকও একদিন ওগুলোর অনুবাদ করিয়ে নিয়ে তাদের নিজেদের কবির কত অনাবিষ্কৃত সৌন্দর্য দেখতে পেত" এই না পারার আফসোস সৈয়দ মুজতবা আলীর সবসময় ছিল। তার মনে হয়েছে একমাত্র ক্ষিতিমোহন সেনের কালিকলমে এর কিছুটা উঠে এসেছে। বিশ্বভারতীর কলেজ বিভাগে আলীই বাইরের প্রথম ছাত্র। কবিগুরুর সাথে সাক্ষাতের প্রথমে কী পড়ার ইচ্ছের উত্তরে বলেছিলেন কোন একটা বিষয় ভালো করে শিখতে চাই। ধারণা ছিল মনকে চারদিক ছড়িয়ে দিলে কিছুই ভালো শেখা যায় না। রবীন্দ্রনাথ মূলেই এই ভুল ভেঙে দেন। বহুর মধ্যে একের সন্ধান এই জীবনদর্শনের সাথে পরিচিত করান। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে কবিগুরুর মুখে শুনেছেন_ 'একতারা থেকে যে সুর বেরোয় তাতে সরলতা আছে কিন্তু সে সরলতা একঘেয়েমির সরলতা। বীণা বাজানো ঢের শক্ত। বীণাযন্ত্রে তার অনেক বেশি, তাতে জটিলতাও অনেক বেশি। বাজাতে না জানলে বীণা থেকে বিকট শব্দ বেরোয় কিন্তু যদি বীণাটাকে আয়ত্ত করতে পার তবে বহুর মধ্যে যে সামঞ্জস্যর সৃষ্টি হয় তা একতারার একঘেয়েমির সরলতার চেয়ে ঢের বেশি উপভোগ্য। আমাদের সভ্যতা বীণার মতো, কিন্তু আমরা এখনও ঠিকমতো বাজাতে শিখিনি। তাই বলে সেকি বীণার দোষ, আর বলতে হবে যে একতারাটাই সবচেয়ে বেশি ভালো বাদ্যযন্ত্র।"এই মূল সুরধারী গুরুদেবকে দেখেছেন প্রাত্যহিক জীবনে কঠিন সময়ানুবর্তিতা মানতে। উপাসনা, লেখাপড়া, পাঠদান, সংগীত চর্চা বা শোনা সেই সাথে সাহিত্যের বাইরে ধর্ম, রসায়ন, পদার্থ, নৃবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, সমাজতত্ত্ব, দর্শন, পল্লীউন্নয়ন, রাজনীতি, সাম্পদ্রায়িকতা এমন কিছু ছিল না যে জগতে তার অনুসন্ধিৎসা ছিল না। আজীবন জ্ঞান সাধক এই মানুষটিকে একই সাথে দেখেছেন 'ইন্দ্রিয়ের দ্বার রুদ্ধ করি যোগাসন সে নহে আমার' পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ উপভোগের আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন কঠোর সংযমী। বড় ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ও অনেক বছর শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সাথে কাটান। উভয়ের মধ্যে আলাপচারিতা বেশি না থাকলেও দুই ভাইয়ের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সৈয়দ মুজতবা আলীর নজরে এসেছে। দ্বিজেন্দ্রনাথের মুখে শুনেছেন_ 'আমাদর সকলেরই পা পিছলেছে, কিন্তু রবির কখনও পা পিছলায়নি।'অন্তরে-বাইরে কবির কোন ফাঁক চোখে পড়ে নাই বরং মানুষ রবীন্দ্রনাথকে দেখেছেন 'আর পাঁচজন কবি কিংবা গায়কের মতো আপন কবিতা বা গান রচনা করার পর চট করে ধুলার সংসারে ফিরে এসে রাম শ্যাম যদুর মতো তাসপিটে হুঁকো টেনে দিন কাটাতেন না।' দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি ক্ষেত্রে বেশভুষা বাক্যালাপে কবিজনোচিত বাক্যের বাইরে বেমানান কোন শব্দ ছাত্রদের পড়ানোর জন্য নিজের বা অন্যের সাহিত্যের ক্ষেত্রেও নিজে পড়া তৈরি করে আসতেন। ক্লাসেরই বৃহত্তর রূপ ছিল তার সাহিত্যসভা। সেখানে ও তিনি একদিকে নিয়ামানুরাগী অন্যদিকে কঠোর পরিশ্রম করে প্রস্তুতি নিয়ে আসতেন। 'যদিও আমাদের সাহিত্যসভা নিতান্ত ঘরোয়া ব্যাপার তবু তিনি যেভাবে সে সভা চালাতেন, তার থেকে মনে হতো_ অন্তত আইনের দিক দিয়ে যেন তিনি কোনও লিমিটেড কোম্পানির শেয়ার-হোল্ডারের মিটিং পরিচালনা করছেন।' সময়, আলোচ্য বিষয়, বক্তা, সভাপতির ভাষণ সবটার খুঁটিনাটি দেখতেন। বিভিন্ন আসরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেও কোন পদ্ধতিতে নিজে ক্রম পরিপূর্ণতার পথে এগিয়েছেন তা নিয়ে তেমনভাবে কথা বলেননি। এ যেন তার একান্ত নিজস্ব। রবীন্দ্রনাথের কথা বলার সম্মোহনী শক্তি ছিল আশ্চর্য। জার্মানির মারবুর্গ শহরে এক বড় জনারণ্যে একঘণ্টা বক্তৃতা দেবার সময় সৈয়দ মুজতবা আলী উপস্থিত ছিলেন। অবাক হয়ে দেখেছেন_ 'একটি বারের মত সামান্যতম একটি শব্দও সেই সম্মিলিত যোগসমাধির ধ্যানভঙ্গ করল না। আমার মনে হল গুরুদেব যেন কোনও এক অজানা মন্ত্রবলে সভাস্থ নরনারীর শ্বাসপ্রশ্বাস পর্যন্ত স্তম্ভন করে দিয়েছেন। ডাইনে-বাঁয়ে তার শব্দটুকুও শুনতে পাইনি।_ 'সভাশেষে শিষ্যকে পেয়ে নানা আলোচনার ফাঁকে শরীর স্বাস্থ্য-খাবার ঠিকমতো আছে কিনা সে খোঁজও নেন। সবদিকেই তার দৃষ্টি ছিল। যা অনায়াসে মনে করায়,_'আমার গুরুর পায়ের তলে/শুধুই কিরে মানিক জ্বলে? চরণে তার লুটিয়ে কাঁদে/লক্ষ মাটির ঢেলারে।আমার গুরুর আসন কাছে/সুবোধ ছেলে কজন আছেঅবোধ জনে কোল দিয়েছেন/তাই আমি তার চেলারে।'কর্মজীবনের প্রথমে কাবুলে সহকর্মীদের চেয়ে মুজতবা আলীর বেতন বেশি ছিল। এই বৈষম্যর উত্তরে আফগান শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ছিল_'মুজতবা আলীর সনদে আছে রবীন্দ্রনাথের দস্তখত_ সেই রবীন্দ্রনাথ যিনি সমগ্র প্রাচ্যের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।'_ রবীন্দ্রনাথের ভাষণ যখন যে দেশে হয়েছে তার কণ্ঠস্বরের মাধুর্য, বাক্যের ওজস্বিতা, ধ্বনির ইন্দ্রজাল ঘিরে শোনা যেত উপস্থাপনা_ ঞযৎড়ঁময ধমবং ওহফরধ যধং ংবহঃ যবৎ াড়রপ. বুক ফুলে উঠত গর্বে। মনে হত, আমার গুরুদেব ভারতবর্ষের, আমিও ভারতবাসী। রবীন্দ্র সাহিত্য বহু ভাষায় অনুদিত হয়েছে। অনুবাদে রবীন্দ্রকাব্যর গীতিরস সঠিকভাবে পেঁৗছায়নি। অনুবাদ জগতে রবীন্দ্রনাথ নিজে বেশি কাজ করেননি। ইউরোপ সেইভাবে এই সাহিত্যের মর্ম উপলব্ধি করতে পারেনি। বিশ্ববাসী তাঁকে নিয়ে যে সম্মান দেখিয়েছে বা আনন্দ করেছে তার অনেকেটাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে রবীন্দ্রনাথের সত্য পরিচয়ের উৎস থেকে উদ্বেলিত হয়নি। সঠিকভাবে অনুবাদ হলে রবীন্দ্রনাথের সত্য পরিচয় একদিন সারা পৃথিবী জানবে এবং এও জানবে রবীন্দ্রনাথ নিত্য নবীন। এই বিশ্বাস মুজতবা আলীর আজীবনের। কিন্তু শুধু ইউরোপ বা বহির্বিশ্বই হবে কেন? বা ভালি রবীন্দ্রনাথকে কতটা চিনেছে এটাই জিজ্ঞাসা। "রবীন্দ্রনাথের কাব্য প্রতিভা, কাব্য নির্মাণ ক্ষমতা, দার্শনিক চিন্তাশক্তি, সার্বভৌমিক ধর্মানুভূতি, উপন্যাসিক অন্তর্দৃষ্টি, বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, ঐতিহ্যগত শিক্ষাদান প্রচেষ্টা, বৈয়াকরণিক অনুসন্ধিৎসা সব কিছু মিলিয়ে তাঁর অখ-রূপ হৃদয়মনে অাঁকার কথা দূরে থাক, যেখানে তিনি ভারতের তথা পৃথিবীর সব কবিকে ছাপিয়ে গিয়েছেন তারই সম্পূর্ণ পরিচয় পেয়েছে কজন বাঙালি?' ছোটগল্পের প্রথম পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথের ঢিলেঢালা ভাব পরবর্তীতে মোপাগাঁর ঠাসবুনানী আর চেখফের ক্লাইমেকেসর প্রভাবে কেটে যায়। শুধু কেটেই যায় না "মানব চরিত্রের আলো অন্ধকারের আবছায়ার অাঁকুবাঁকু, মানবচরিত্রের যে দিক দৈনন্দিন জীবনে আমাদের চোখে পড়ে না, মানুষকে যে সবসময় তার বাক্য আর আচরণ দিয়েই চেনা যায় না, মানুষের সেই দুর্জ্ঞেয় অন্তঃস্তল রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেছিলেন আধা আলোরই ভাষা এবং ভঙ্গি দিয়ে প্রকাশ করতে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ একা। মোপাগাঁ চেখফের সঙ্গেঁ তাঁর যোগসূত্র সেখানে সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে গেছে।"সৈয়দ মুজতবা আলীর বিশ্লেষণ।রবীন্দ্র কাব্য প্রতিভার মহত্তম বিকাশ তাঁর গানে। দুই বাংলার প্রকৃতিকে তিনি নিবিড়ভাবে দেখেছেন। শিষ্যর 'ভ্রমণগুরু' রবীন্দ্রনাথ পাহাড়, সমুদ্র ঘুরেছেন, দেশে দেশে প্রকৃতির বহু বৈচিত্র্য রূপ দেখেছেন অভিভূত হয়েছেন। কিন্তু নিজের কবিতায় গানে মূলত সাধারণ বাঙালির নিত্য চেনা জানা প্রকৃতিতেই বেশি মাত্রায় আশ্রয় করেছেন। এবং কখনো কখনো প্রকৃতিকেও তিনি অতিক্রম করেছেন।"আজ এনে দিলে হয়তো দিবে না কালরিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল।এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবণেতব বিস্মৃতি স্রোতের প্লাবনেফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে তরুণীবহি তব সম্মান"এ এক আশ্চর্য অনুভূতি! আশ্চর্য অহংকার!!গ্রাম বাংলার মাঠেঘাটে অনাদরে জন্মানো শুধু একটা কদম ফুল। প্রকৃতির কত নগণ্য সৌন্দর্যকভু। ক্যাথলিকদের সঙ্গীতের ভাষার মতো ক্যাননাইজড হয়ে যুগ যুগ ধরে স্পর্শকাতর হৃদয়কে আকর্ষণ করে এমনি মনে হয়েছে সৈয়দ মুজতবা আলীর। তাঁর ভাষায়, "রবীন্দ্রনাথের গান কখনই অসম্পূর্ণরূপে আমার সামনে দাঁড়ায়নি। তাঁর শুনে যদি কখনো মনে হয়ে থাকে এ গান আমাকে অতৃপ্ত রেখে গেল তবে তার প্রধান কারণ গানের অসম্পূর্ণতা নয়, তার কারণ অতিশয় উচ্চাঙ্গের রস সৃষ্টি মাত্রই ব্যঞ্জনা এবং ধ্বনি প্রধান। তার ধর্ম সম্পূর্ণ তৃপ্ত করেও ব্যঞ্জনার অতৃপ্তি দিয়ে হৃদয়মন ভরে দেয়া।তখন মনে হয় এ গান আমার সামনে যে ভুবন গড়ে দিয়ে গেল তার প্রথম পরিচয়ে তার সবকিছু আমার জানা হলো না বর্ষে কিছু খেদ নেই, আবার শুনব তখন সে ভুবনের আর ও অনেকখানি আমার কাছে উদ্ভাসিত হযে উঠবে আর এমনি করে একদিন সে ভুবন আমার নিতান্ত আপন হয়ে উঠবে। কোনো সন্দেহ নেই এ রকম ধারাই হয়ে থাকে কিন্তু আর একটি কথা তার চেয়ে ও সত্য রবীন্দ্রনাথের কোনো গানই কখনো নিজেকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে না।"এই অনিঃশেষ প্রাণশক্তিই রবীন্দ্র সঙ্গীত। আমাদের শ্রেষ্ঠতম সঙ্গীত।এত অজস্র সৃষ্টির যিনি সৈয়দ মুজতবা আলী দেখেছেন সেখানে ও একের পর এক নির্মম কঠোরতা, নিদারুণ বেদনা, একের পর এক মৃত্যুদূত ছিনিয়ে নিয়ে গেছে প্রিয়জনকে। প্রিয়জনের কষ্ট দুর্ভোগে কষ্ট পেয়েছেন, ব্যথিত হয়েছেন। কখনো তিনি এসব সুখ-দুঃখের ঊধর্ে্ব উঠে ব্রহ্মানন্দে লীন হতে চাননি। "রবীন্দ্রনাথ দুঃখে আমাদের মতোই কাতর হতেন- হয়তো বা আরও বেশি, কারণ তাঁর দিলের দরদ হৃদয়ের স্পর্শকাতরতা ছিল আমাদের চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি কিন্তু তিনি পরাজয় মানতেন না। আমরা পরাজয় মেনে নেই। ... সে নেই কিন্তু আমার ভালোবাসার মধ্যে সে 'আছে।' বার বার নমস্কার করি গুরুকে, গুরুদেবকে।"রবীন্দ্রনাথের এই দুঃখ-বেদনা বহনের ক্ষমতাকেও নিজের কাছে টেনে নিয়ে মুজতবা আলী ভেবেছেন "তিনি আমাদের মতো পাপীতাপীদের যে ভাঙা নৌকা সেটা ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে চাননি। সুখের মলয় বাতাসে ঝঞ্ঝাবাতের ক্রূর আঘাতে নিমজ্জমান তরীতে বসে তিনি আমাদের শুনিয়েছেন, প্রকাশ ক্ষমতা আমাদের নেই। যুধিষ্টিরের মতো তিনিও স্বর্গারোহন করতে চাননি।" জীবনের শেষ কবিতাতেও সেই একই মানসিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ দেখিয়েছেন।রবীন্দ্রনাথের কর্মজীবন বিশেষত শান্তি নিকেতন বিশ্ব ভারতী নিয়েও অনেক প্রতিকূলতা সহ্য করতে হয়েছে। নিজ হাতে বহু কৃতিজন বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছে না দেশে-বিদেশে তাদের কৃতিত্বে আনন্দিত হয়েছেন। নিজের প্রতিষ্ঠানে তাদের পাশে পাওয়া জরুরি ছিল। শিষ্য মুজতবাকে বলেছিলেনস "কিন্তু তোদের আনবার সামর্থ্য আমার কোথায়?" অর্থ সংকটে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেবার ক্ষমতা ছিল না।"বিশ্ব ভারতীর সেবার জন্য যদি আমাকে প্রয়োজন হয়, তবে ডাকলেই আসব। যা দেবেন হাত পেতে নেব।" মুজতবা আলীর কাছ থেকে এই উত্তরই তিনি আশা করে ছিলেন। হিন্দু মুসলিম কলহ নিয়ে তার নিদারুণ মনোবেদনার কথাও তিনি নিঃসংকোচেই জানাতেন। রবীন্দ্র সাহিত্য সঙ্গীতের বিশাল ভা-ার থেকে রবীন্দ্রনাথকে সমগ্রভাবে গ্রহণ করার সত্যি কারোরই হয়তো নেই। সৈয়দ মুজতবা আলী এ ক্ষেত্রে নিজের সীমাবদ্ধতা বারবার স্বীকার করেছেন। দুঃখ করেছো তাঁর বিশ্বরূপ দেখাবার মতো পা-িত্য এখনও জন্মেদিন বলে।" কবি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ধরা-ছোঁয়ার অতীত, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কিন্তু আমাদের কাছে তিনি সে ছিলেন স্নেহাসক্ত গুরু, নিতান্তই মাটির মানুষ। কিন্তু মানুষ রবীন্দ্রনাথের স্বরূপ উদঘাটিত করা ও যে দুঃসাধ্য। হিমালয়ের পাদমূলে বসে বিচিত্র পুষ্প চয়নকালেও ক্ষণে ক্ষণে গৌরীশখরের বিরাট বিশাল গম্ভীর মহিমা হৃদয়কে নির্বাক বিস্ময়ে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।... রবীন্দ্রনাথ আমাদের গুরু এবং তিনি কবি। তাই তিনি আমাদের কবিগুরু। তিনি অবশ্য তাবৎ বাঙালির কাছেই 'কবিগুরু'। কিন্তু সেটা অন্যার্থে অন্য সমাস।....গুরুদেব আজ নেই।কিন্তু সেই হারানো দিনের স্মৃতি আজও আমার মনে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।_' এমনই স্মৃতিক তর্পণের এক পর্যায়ে সৈয়দ মুজতবা আলীর আর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি।_ 'সবাই জানে শান্তিনিকতেন আমার শিক্ষা। লেখার চেয়েও রবির শিষ্য এজন্যই আমি বেশি সম্মানিত।'_ এর চেয়ে অতিরিক্ত গুরুদক্ষিণা কীইবা থাকতে পারে?

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close