logo

orangebd logo
রবীন্দ্রনাথ : বাঙালির মানস প্রতিমূর্তি
জামিরুল ইসলাম শরীফ

যে কোনো বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের মূল্য-নিরূপণ আমার পক্ষে অশোভন ও হাস্যকর এবং যথাসাধ্যে কুলাবে না জেনে সে চেষ্টায় আমি স্বভাবত নিরুত্তর। প্রতিভার প্রদোষে তার সমস্ত রচনারীতি, স্তরভেদ, চিন্তার গতিপ্রকৃতি, এমনকি অনুভূতিপ্রকরণের ক্রমবিকাশ তার কাব্য ও কবিজীবন আমার কাছে বিশ্ব-ব্রহ্মা-ের মতোই অনিন্দ্য ও অখ- ঠেকে। সাহিত্যের সীমা যে কতদূর তার পরিমাপ নিশ্চয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও আবেগগ-ির বাইরে। ফলে মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আহরণ বুঝি মহাকালের নিরুদ্দেশযাত্রার কালস্রোতে কূল খুঁজে পাবে না। এই ব্রহ্মা-লোক যদ্দিন চিরতিমিরে তলিয়ে যাবে না, ততদিন কী বিজ্ঞানে, কী সাহিত্যে প্রগতি ও প্রবর্তনাও থামবে না। অমোঘ সত্যের পরিণামে সময়ের গ-ি যেহেতু সামান্য থেকে বিশেষের দিকে ছোটে তখন সাহিত্যের চোরাবালিতে পথ আটকাবে না, রূপের মায়াবী মরীচিকা দিগবিভ্রম ঘটাবে না। বিজ্ঞানের আনুপূর্বিক অন্তর্হিত শৃঙ্খলা যেহেতু অভাবনীয়, সেহেতু জগতের আনন্দময় রূপ-রস প্রথার আন্তরিক প্রণয়ে গড়ে ওঠে সাহিত্য-শিল্প-সঙ্গীত; আধুনিক বা অনাধুনিক যাই বলা হোক না কেন, মানুষের অস্তিত্বের প্রয়োজনে ও স্বাধীনতায় সাহিত্য-শিল্প-সঙ্গীতের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য। বৈজ্ঞানিকের আদর্শ, গণিতজ্ঞের সমর্থন ও ব্যাখ্যা এবং কবি ও মরমীদের প্রজ্ঞা ও সাধনা যে বিস্মিতের সন্ধান করেই ফিরুক না কেন বিশ্বব্রহ্মা- যেহেতু রহস্যকেন্দ্রিক তখন উভয়ের বিচারে চৈতন্য জগতের প্রথম ও প্রধান উপকরণ, এবং সত্য-সন্ধানীর আদর্শে ও আয়ত্তে অবগতিই যখন জগত-স্বরূপ সম্বন্ধে আমাদের কৌতূহল মেটায়, তখন রবীন্দ্রনাথ সহজাত প্রতিভায় সন্তুষ্ট না হয়ে চৈতন্যের ব্যাপ্তি-কামনায় প্রচুর ইচ্ছাশক্তি ও প্রখর দৃকশক্তির গুণে নানা বিদ্যা আয়ত্তে সমর্থ হয়েছিলেন,এবং স্বকীয় মহত্ত্বের উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতায় তিনি নির্বিরোধ সত্যে পেঁৗছেছিলেন; যদিও এ পর্যন্ত জগতশ্রেষ্ঠ কাব্য-রচয়িতারা কালের হাতে নিজেদের সঁপে দেননি, বা অদৃষ্টের উপাসকও নন, ক্ষতির আশংকাও মাথায় রাখেননি; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আমার জন্মের বহু পূর্বেই বহু বিজ্ঞ-অজ্ঞের বিদ্রূপ সয়ে যুগান্তরের দুর্যোগ কেটে বিশ্বসাহিত্যের গ্রহপতির আসন স্থায়িত্বের অধিকারে নিয়েছেন।রবীন্দ্রনাথের বিশুদ্ধ গদ্য, যে কোনো বিচারে তার সারগর্ভ প্রবন্ধাদি বলতে পারি সত্যসন্ধানী প্রবন্ধ-রচনাগুলো সর্বসম্মতির উপরেই প্রতিষ্ঠিত; অতুলনীয় সৃজনশক্তির পরিচয় 'ছেলেবেলা', 'রোগশয্যা', 'আরোগ্য', 'বিশ্বপরিচয়' কবিতায় 'পরিশেষ', 'প্রবাহিনী', 'পূরবী', 'মহুয়া', 'উর্বশী', 'পুনশ্চ', সোনার তরী', ও 'লিপিকা' প্রভৃতি অমূল্য সম্পদ। যৌবনে 'চিত্রাঙ্গদা'-র মতো কাব্যবিশেষের সাহায্যে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের কোঠায় পেঁৗছে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, স্বজাতিকে ম্বাবলম্ব হতে যেমন শিখিয়েছেন, ভ্রমণকাহিনী লিখে সময়ে সময়ে পৃথিবী পর্যটনেও নামিয়েছেন। কবিতার স্বপ্নময় উপমা, ছন্দ ও ধ্বনির মোহজালে, মুক্তছন্দে চিত্রগত সার্থক কাব্যস্বরূপে রসোত্তীর্ণ। অভিনিবেশ-সহকারে লক্ষ্য করলে ধরা পড়বে রবীন্দ্রসাহিত্যের বিকিরণ, এবং বলা বাহুল্য রবীন্দ্রনাথ যে-পথেই গেছেন, তার অব্যর্থ প্রয়াণ সত্ত্বেও তিনি যেন অমৃতলোকে পেঁৗছান এবং বাইশে শ্রাবণ প্রয়াণ দিবসটি আমার কাছে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাবর্তন বলে মনে হয়_ অর্থাৎ 'মৃত্যুর পরে' আসলে তা 'জন্মের আগে'_ অভিনবরূপে আসে।মানুষ তো চিরায়ু হয়ে আসে না, তবু একাশি বছরের আমন্থর আয়ুব্যাপী একজন কবির যে অভ্যুদয় সেখানে তার সমগ্র উপলব্ধি নৈরাত্ম রূপের প্রাণপণ ধ্যানে অমরতা পেয়ে গেলেন এবং ্আমার কাছে সেই পরিমাণ বিস্ময় লেগেছে যে মৃত্যুর আশংকায় আমরা নিরন্তর তটস্থ থাকি বটে এবং মরণের উপলব্ধি যেহেতু সব মানুষের মধ্যে পরোক্ষ, তখন রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ জীবন ও অনুপম সাধনা নিশ্চিত আকাশস্পর্শী এবং তাঁর দেহাবসানের পরে আমরা দেখি কবিজীবন ভঙ্গুর প্রাণের আবরণ ঘুচে ফুটে বেরোলো হৃদয়শতদলের সকল পাপড়ি। সে সৃষ্টির গতিময় দ্যোতনা এমনই সক্রিয় ছিল যে, পুরাকালে সফোক্লিস পরে গ্যেটে ও টেনিসন বাদে প্রাণপ্রতিম অপর কবিরা যখন আশির পরে আর কলম চালাতে পারেননি তখন তাঁরও লেখার অজস্রতা বন্ধ হয়ে গেছে; বার্ধক্যের স্থবির মৌনতা দুর্বিষহ করে তুলেছিল এমনও মনে হয় না_ বললেন, "অনেক সময় কেটেছে বাক্যে, তার পরে সুরে, এখন দিনান্তে সময় এসেছে মৌনের।"বার্ধক্যের মৌনতায় এসে না দাঁড়ালে জীবনের মধুরতা, কী অতীত হৃদয়ঙ্গমতা ঠিক অনুভূত হয় না। এই অনুভূতির নিরন্তর প্রবাহে রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রাহী জীবননিষ্ঠা কাব্য ও সঙ্গীতের চিরন্তরের গত্যন্তরে আমাদের পেঁৗছে দেয়, অর্থাৎ মানুষের শক্তির পরিমাণ এত নগণ্য যে এই বিশ্ব তার কাছে রহস্যঘেরা, বিস্ময়ের, অমিত নয়; তখন কাব্যের ভিতর দিয়ে এই সঙ্কীর্ণ জগত আমাদের কাছে অনন্ত ঠেকে এবং সঙ্গীতের ব্যঞ্জনায় রহস্যের দুশ্ছেদ্যতা ভাঙে, গতানুগতিকের বাইরে, বাণী-সুরপ্রকরণের আকারে ধরা পড়ে এক অদ্ভুত মন্ময় উপলব্ধি। আমার কাছে এইটেই কাব্য ও সঙ্গীতের অত্যাশ্চার্য গুণ মনে হয়। রবীন্দ্রসাহিত্য ও সঙ্গীত ঐকান্তিক মহত্ত্বের বিকিরণে বিশ্বসীমার অপার মহিমায় আমাদের ধ্যানস্থ মন আনন্দময় প্রদক্ষিণে নামে; যদিও তার স্থায়িত্ব কম, কারণ বাহ্যতার চাপ, দায়পরিগ্রহে মানুষ আষ্টে-পৃষ্ঠে বাঁধা। আবার বুদ্ধিময় আবেগের অভিব্যক্তি স্বভাবতই সুলভ; সেখানে আবেগ ঐকান্তিক ও নৈর্ব্যক্তিক নয়; কেমল ভাবানুষঙ্গ মাত্র। মনুষ্যধর্মের ভিত্তিতে রবীন্দ্রনাথ যেহেতু কবি, সুতরাং তিনি বাহ্য পরিদর্শনে থেকেও স্বকীয় সুরে সঙ্গীতের অনন্ত অন্তরীক্ষে বিশ্ব-বৈচিত্র্যের যোগে ও ভোগে একাকার। এই প্রসঙ্গে যথার্থই মনে আসে 'সংগীতচিন্তা'য় তিনি ধূর্জটিপ্রসাদকে লিখেছেন,"অপেক্ষাকৃত অবিচলিত থাকা আমার পক্ষে এই জন্যে সহজ যেহেতু জীবনে অনেক অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে এসেছি। প্রথম যখন কবিতায় আধুনিকতা প্রকাশ করেছিলুম সে অনেকদিনের কথা, তোমার জন্ম হয়নি। তখন প্রবীণের দল, যাঁদের কাব্যে শাস্ত্র সম্বন্ধীয় অলংকার ছিল তৎকালীন হিন্দুস্থানী ছাঁচে ঢালা তারা আমার অশাস্ত্রীয় ছন্দ প্রভৃতি ঠিক এই রকম কথা বলেছিলেন, অর্থাৎ তাদের অভ্যাসপীড়া ঘটিয়েছিল বলে কোনো মতেই আমার রচনার ধারা তাঁদের একটুও ভালো লাগছিল না। এত বড় জোরালো কথার উপরে কারো জোর খাটে না_ কিন্তু দেখলুম চুপ করে গেলেই তার জোর আপনি মরে আসে। আমার কাব্যও ভালো লাগে না এমন লোক বিপুলা পৃথিবীতে দুর্লভ হবে না_ কিন্তু আমার কাব্য ও ছন্দের ধারাটা ব্যবহার করছেন না এমন কবি বাংলায় আজ নেই_ এ কথা বললে অহংকারের মতো শুনতে হবে তবু কথাটা মিথ্যে হবে না। যখন প্রথম সাধু নিয়ম ভাঙা চালে কাব্য লিখতে আরম্ভ করেছি সেটাকে প্রাগৈতিহাসিক যুগ বললেও চলে, তার পরে আজ বয়স হল সত্তর, ইতিমধ্যে ইতিহাসটা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে তা নির্ণয় করবার সময় পাওয়া গেল_ কিন্তু আমার গান সম্বন্ধে ইতিহাসের গতি নির্ণয় করবার সময় পাব না, তোমরা হয়তো কিছু আভাস পেতে পারবে, তখন আমার সময় চলে গেছে, কারণ ভূতকাল থেকে ভূতের কাল পর্যন্ত কোনো সেতু নেই।"আরেক চিঠিতে লিখছেন,"মানুষের সুখ-দুঃখে এ বিশ্বের ভাষাকে যখন আহ্বান করা হয় বাণী তখন কেবলমাত্র ছন্দের বাহনরূপেই তার সাহচর্য করে। কাব্যে গানে যে অনির্বচনীয়তার প্রকাশ ঘটে মুখ্যত সেটা বচনে নয়, সেটা ছন্দে। এ কথা আজ সবাই জানে বিদ্যুৎকতার ছন্দোবৈচিত্র্যেই বিশ্বের সৃষ্টি-বৈচিত্র্য। বিশ্বের সেই সৃষ্টি উৎস থেকেই ছন্দের ধারাকে মানুষের অঙ্গের মধ্যে সঞ্চারিত করলে সৃষ্টিলীলা অব্যবহিতভাবে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে।"তাহলে বাণী ও ছন্দের প্রত্যক্ষ প্রকাশের বাহন নিশ্চয় ভাষা। সময় এবং কালে মানুষের ধ্যান-ধারণা সে যে-ভাষারই মুখাপেক্ষী তা রবীন্দ্রনাথেরই অন্যতম দান। বাঙালির যে গৌরব এবং বাংলাদেশের বর্তমান যে সংস্কৃতি তা তাঁর সৃষ্টি, তেমনি আজ পর্যন্ত একা তিনিই বাঙালির আধুনিক ভাষা ও সংস্কৃতির প্রমাণসিদ্ধ; এবং আজ পর্যন্ত সকল দার্শনিক ও সাহিত্যপ্রবক্তারা মেনে নিয়েছেন যে, শেষ পর্যন্ত পরমার্থে অর্থাৎ স্বার্থত্যাগে অভীষ্টতম লক্ষ্যে পেঁৗছানোও ভাষার ব্যাপার। আমার অন্তত সংশয় নেই যে এই আত্মোপলব্ধির অন্যতম উদ্যোক্তাও রবীন্দ্রনাথ। ফলে রবীন্দ্রসাহিত্যের ভাষান্তর প্রকৃতপক্ষে এখনো বুঝি অসাধ্য। তবু রসপ্রতিপত্তিতে যথেচ্ছ ব্যাঘাত ঘটে না, যেটা ব্যত্যয় ঘটায় তা আমাদের পাঠাভ্যাস ও রবীন্দ্রনাথের অন্তর্দর্শনের মূল্য আমরা বুঝিনি বলেই। অথচ বিদেশি কবিদের লেখা ও তাদের নাম মুখস্থ থাকলে আমাদের বিদ্যাভিমানটা সাধারণ্যে বেশ প্রশংসা কুড়ায়। এর কারণও আছে যে পরের মুখের ঝাল খাওয়ার আদি অভ্যাসটি আমরা আজও ছাড়তে পারিনি। রবীন্দ্রনাথেরই ভাষ্য: "যে ব্যক্তি নিজের ভাষা আবিষ্কার করিতে পারিয়াছে, যে ব্যক্তি নিজের ভাষায় নিজে কথা কহিতে শিখিয়াছে, তাহার আনন্দের সীমা নাই। ... ব্যক্তিবিশেষ সম্বন্ধে যাহা খাটে, জাতি সম্বন্ধেও তাহাই খাটে। চারিদিক দেখিয়া শুনিয়া আমাদের মনে হয় যে, বাঙালি জাতির যথার্থ ভাষাটি যে কী তাহা আমরা সকলে ঠিক ধরিতে পারে নাই_ বাঙালি জাতির প্রাণের মধ্যে ভাবগুলি কিরূপ আকারে অবস্থান করে তাহা আমরা ভালো জানি না। এই নিমিত্ত আধুনিক বাংলা ভাষায় সচরাচর যাহা কিছু লিখিত হইয়া থাকে তাহার মধ্যে যেন একটি খাঁটি বিশেষত্ব দেখিতে পাই না। পড়িয়া মনে হয় না বাঙালিতেই ইহা লিখিয়াছে, বাংলাতেই ইহা লেখা সম্ভব এবং ইহা অন্য জাতির ভাষায় অনুবাদ করিয়ে তাহারা বাঙালির হৃদয়-জাত একটি নতুন জিনিস লাভ করিতে পারিবে। ভালো হউক মন্দ হউক, আজকাল যে সকল লেখা বাহির হইয়া থাকে তাহা পড়িয়া মনে হয়, যেন এমন লেখা ইংরাজিতে বা অন্যান্য ভাষায় সচরাচর লিখিত হইয়া থাকে বা হইতে পারে। ইহার প্রধান কারণ_ এখনো আমরা বাঙালির ঠিক ভাবটি, ঠিক ভাষাটি ধরিতে পারি নাই। সংস্কৃতবাগীশেরা বলিবেন, 'ঠিক কথা বলিয়াছেন_ আজকালকার লেখায় সমাস দেখিতে পাই না, বিশুদ্ধ সংস্কৃত কথার আদর নাই, একি বাংলা! আমরা তাহাদের বলি, 'তোমাদের ভাষাও বাংলা নহে, আর ইংরাজিওয়ালাদের ভাষাও বাংলা নহে। সংস্কৃত ব্যাকরণেও বাংলা নাই, আর ইংরাজি ব্যাকরণেও বাংলা নাই, বাংলা ভাষা বাঙালিদের হৃদয়ের মধ্যে আছে। ছেলে কোলে করিয়া শহরময় ছেলে খুঁজিয়া বেড়ানো যেমন, তোমাদের ব্যবহারও তেমনি দেখিতেছি। তোমরা 'বাঙ্গালা বাঙ্গালা' করিয়া সর্বত্র খুঁজিয়া বেড়াইতেছ, সংস্কৃত ইংরাজি সমস্ত ওলটপালট করিতেছ, কেবল একবার হৃদয়টার মধ্যে অনুসন্ধান করিয়া দেখ নাই। আমাদের সামালোচ্য গ্রন্থে একটি গান আছে_আমি কে তাই আমি জানলেম না,আমি আমি করি কিন্তু, আমি আমার ঠিক হইল না।কড়ায় কড়ায় কড়ি গণি,চার কড়ায় এক গ-া গণি,কোথা হইতে এলাম আমি তারে কই গণি!আমাদের ভাব, আমাদের ভাষা আমরা যদি আয়ত্ত করিতে চাই, তবে বাঙালি যেখানে হৃদয়ের কথা বলিয়াছে সেইখানে সন্ধান করিতে হয়। যাহাদের প্রাণ বিদেশী হইয়া গিয়াছে তাহারা কথায় কথায় বলেন_ ভাব সর্বত্রই সমান, জাতিবিশেষের বিশেষ সম্পত্তি কিছুই নাই। কথাটা শুনিতে বেশ উদার, প্রশস্ত। কিন্তু আমাদের মনে একটি সন্দেহ আছে। আমাদের মনে হয়, যাহার নিজের কিছু নাই সে পরের স্বত্ব লোপ করিতে চায়।...অতএব আমাদের সাহিত্য যদি বাঁচিতে চায় তবে ভালো করিয়া বাংলা হইতে শিখুক।"সাম্প্রতিক ভাষার বানান রীতি, বাক্যগঠন, অর্থ প্রকাশের উপায়, শব্দ ও ধ্বনির সাহায্যে সাহিত্যসহ নানা মাত্রিক লেখা, ভাবনা-বেদনার স্তরভেদ জ্ঞাপন বাঙালির পক্ষে সহজ হয়েছে_ এগুলো হয়ত অনুপকারী নয়, কিন্তু বাংলা ভাষার প্রাঞ্জলতা কমিয়েছে, আধুনিক বাংলার দ্যোতনা-ব্যঞ্জনা বাড়াতে গিয়ে আমরা ভাষার ঐতিহ্য ও আভিজাত্য অনেকখানি হারিয়েছি। আমাদের ভাষাবিদেরা যে যুক্তিতে ব্যাকরণ বা অভিধান নতুন সংস্করণে খাড়া করুন না কেন, সর্বোপরি আমাদের বেশ-ভূষা আর পোশাকী আটপৌরের মধ্যে আর তফাৎ থাকলো না, অর্থাৎ স্থান-কাল-পাত্র অনুসারে সে আর ভেক বদলায় না, বাড়ির ভেতর যে-সাজে থাকে, প্রকাশ্য রাস্তায়ও সেই পরিচ্ছদে ঘুরে বেড়ায়। তাতে বৈচিত্র্য বেড়েছে বটে, ঐতিহ্য হেরেছে। সবদিক থেকেই বাঙালি তার চারিত্র্যও ঐতিহ্য প্রায় হারাতে বসেছে; কিছু প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মবদ্ধতা ও অনুষ্ঠান, উৎসব ছাড়া দৈনন্দিনতায় তার চিহ্ন নেই। আমার এই অব্যক্ত অনুশোচনা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি নিষ্ফল। বাঙালির সামনে যে সম্ভাবনার দ্বার খুলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তা আজ রুদ্ধপ্রায় আমাদের উদাসীনতা ও কৃতকর্মে।বাইরের ওই পোশাকী আবরণটুক বাদ দিলে আমাদের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন সমাজের গতি অর্ধোন্মাদের মতোই চলছে। এক বেসুর, নিষ্ঠুর অসংগতি আমাদের সমকালীন জীবনধারায় সংস্কৃতের সত্যিকার সম্বন্ধে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে।ভাববিলাসিতা বাঙালি মানসিকতায় ঠিক কবে বাসা বেঁধেছিল, আজ একুশ শতকের প্রথম পাদে তার হিসেব করা দুরূহ। সম্ভবত বাঙালির ভাবনা-বেদনা, মনস্তত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস ও নৃতত্ত্বের সমষ্টি এবং সাংঘঠনিক গবেষণায় ধরা পড়বে যে যুক্তি তথা চিন্তা-ভাবনায় বাঙালির অনীহা কেন এমন মজ্জাগত। সাম্প্রতিকালে একশ্রেণীর ভাষা বা সাহিত্য ব্যবসায়ীদের বাজারী প্রচার ও প্রতাপে সাহিত্যিক জবানে উৎকর্ষকতার পরিচয় তো মেলেই না, উপরন্তু বাংলা ও সাহিত্য হাটের ব্যাপারীদের ভাষায় পরিণত হয়েছে, এই কথা আমরা অহরহই বলি, কিন্তু আমাদের লজ্জা হয় না। বাক্চাতুর্য বাংলা গদ্যের মানদ- হয়ে দাঁড়িয়েছে, খেয়ালী হৃদয়ের বাচাল অভিব্যক্তি ও তার প্রকাশের শোকাবহ দুর্গতি দেখে শোচনায় মরি। অথচ আমাদের সমস্ত প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথকে আমরা নির্মোহভাবে স্মরণ ও গ্রহণ করতে পারতাম, এই না পারার অক্ষমতায় আমরা মনের দিক থেকে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র হতে হতে বাইরে চাক-চমকটা জৌলুস ছড়িয়েছে বটে, চেতনা গেছে মরে, জাতিগত বহির্বিকাশ পড়েছে মুখ থুবড়ে। 'রবীন্দ্রপ্রতিভার উপক্রমণিকা": 'পরিচয়' (অগ্রহায়ণ ১৩৪৬ ৯ম বর্ষ ১ম খ- ৫ম সংখ্যা) সুধীন্দ্রনাথ দত্ত লিখছেন_"বস্তুত-রবীন্দ্রনাথ অন্তর্মুখী বেদনাবিলাসীদের অন্যতম নন; অনুভূতির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রকারভেদে তিনি চিরদিন নিরুৎসুক; এবং তার প্রতিভা যদিও আগাগোড়া মন্ময়, তবু তার অফুরন্ত কর্মপ্রবর্তনা বোধহয় সাধারণের বিশেষ সংস্থান থেকে উৎপন্ন। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্ব ও ফ্রয়েডী অনুমিতির পরিপোষক; এবং ফ্রয়েড-এর মতে সাধ বা সাধ্য থাকলেই, মানুষ মহাপুরুষের পদে পেঁৗছায় না, উক্ত সম্মান সে তখনই পায়, যখন তার মুখ্য উপলব্ধি অসাম্প্রদায়িক আদর্শের শাসন মানে, যখন তার মনোমুকুরে স্বদেশের মানচিত্র ফোটে, যখন তার ব্যক্তিস্বরূপ জাতিরূপের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে বদলে যায়। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের অনুভূতি অবশিষ্ট বলেই, তিনি বাংলাদেশকেও স্বকীয় চিত্তবৃত্তির ভাগী করে তুলেছেন; এবং সে অনুভূতি এমনই বিশ্বজনীন, এতখানি সার্বভৌম যে তার অভিব্যক্তি শুধু স্বভাষীর বোধগম্য নয়, আপাতত বিদেশীরাও তার মর্মগ্রহণে সক্ষম। সেই জন্যে রবীন্দ্রনাথের হাতে পড়ে বাংলা ভাষা প্রাদেশিকতার গ-ি পেরিয়ে বিশ্বচেতনার বাহন হয়ে উঠেছে; এবং এই উৎক্রান্তির ফলে সে-ভাষার প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য আর নেই বটে, কিন্তু সম্প্রতি তাতে যে-বৈচিত্র্য দেখা দিয়েছে, তা প্রাগবৈরিক যুগে স্বপ্নেরও অগোচর ছিল।"দুর্ভাগ্যক্রমে কুড়ি ও একুশ শতকের কবি-সাহিত্যিক, ভাষাবিদেরা এ সত্য মনে রাখেননি। আসলে আমাদের অনুভূতির রাজ্যে রবীন্দ্রনাথ শুদ্ধতম চেতনা এবং জাতির প্রাগ্রসর পথের সন্ধান তার পদচিহ্ন অন্যতম স্মারক। সুতরাং 'রবীন্দ্র-রচনাবলী' এবং অবিশ্বাস্য সৃষ্টি তাঁর 'গীতবিতান' নিশ্চয়ই বাঙালির সর্বগ্রাহী জীবননিষ্ঠা, রসপিপাসা এবং স্বকীয় বাণী ও সুরে মনুষ্যধমের ভিত্তি। যা বিশ্বসাহিত্যেও যথেষ্ট দুর্লভ। তিনি শিল্পীই নন, শিল্পেরও জন্মদাতা।অন্তর্দৃষ্টির ব্যাপকতায় রবীন্দ্রনাথ যখন গেয়ে উঠলেন_কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়েসে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।ভুলে গেছি কবে থেকে আসছি তোমায় চেয়ে_সে তো আজকে নয় সে আজকে নয় তখন সে যেন অতীত জীবনের কোনো জন্মান্তরের স্মৃতি। সমস্ত গানটিজুড়ে বিস্ময়কামী অনন্তের বার্তা নিয়ে আসে। রূপের মধ্যে অপরূপের লেশ, যা সহজ চোখে দেখা যায় না, অথচ উপস্থিত। তর্কের অবকাশ থাকে না পরম ঐক্যের আবছায়াটুকু ধরা পড়ে শুধু। অর্থাৎ সৃষ্টির ঠিকানাহীন আনন্দ-স্বরূপ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করে তোলে_ যা আমাদের মানুষী অভিজ্ঞতারও ঊধর্ে্ব।আবার_গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানিতখন তারে চিনি আমি, তখন তারে জানি।তখন তারি আলোর ভাষায় আকাশ ভরে ভালোবাসায়,তখন তারি ধুলায় ধূলায় জাগে পরম বাণী এই যে জগতের অনাবৃত রূপ তা অনবতুল বলেই মনে হয়। পৃথিবীর পথে বিচিত্র দুঃখময়ী পদযাত্রার বিবরণ নেই তাতে; আছে সীমাহীন ভালোবাসা সঞ্চিত আবেগে বিজ্ঞানের মতো সঙ্গীত যে প্রকৃতির অপার রহস্য একে একে অনাবৃত করছে এবং নানা সীমায় নিজের অস্তিত্বই রটিয়ে বেড়ায়। আধুনিক সভ্যতার প্রধান কথা সম্ভবত এই যে, প্রকৃতির সঙ্গে জন্মান্তরীণ রহস্যের যোগে ব্যক্তিসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। শুধু বাঁচিয়ে রেখেও তৃপ্ত নয়, তারও যেন বিস্তার চাই, নইলে যে ব্যক্তিমানুষের অপমৃত্যু ঘটাতে পারে_ রূপের রেখা রসের ধারায়/ আপন সীমা কোথায় হারায়/ তখন দেখি আমার সাথে/সবার কানাকানি_ এই ভাবচ্ছবি অনন্ত রূপ-সৌন্দর্য-বিভার বাহক, তাই কল্পনা ও সত্যের তাৎপর্য বিচারে বাহ্য রূপ নিতান্ত গৌণ, মুখ্য কেবল নিজের ভিতরের সমস্ত অসঙ্গতি কাটিয়ে অনন্য সম্পর্ক স্থাপন।বিষয়বিমুখ না হয়েও রবীন্দ্রনাথের মতো আত্মসন্ধানী কবি ভাবের গভীরতায় নিমগ্নের অবসর খুঁজেছেন অভীষ্ট সংকল্পের স্বরূপ সন্ধানে। মানুষের মনের গভীরে যে রাজ্য আছে অনন্মোচিত তার সন্ধানে রবীন্দ্রসাহিত্যের উৎকর্ষ বিচার আমরা করতে পারি, মানুষের চেতনার ভিতরে যে গোপন-গভীর বোধ চিরকাল তপস্যাকঠিন আদর্শের দিকে_ নির্বিশেষ রবীন্দ্রনাথ সেখানে আত্মশক্তির পরিমিতি। অথচ তার মূল্য বুঝিনি, সীমাহীন শূন্যতার দিকে তাকিয়ে কিসের একটা নির্বাক ভর্ৎসনায় অহংসর্বস্ব এই আমি আক্রান্ত, মুমূর্ষু। এক অনামা অসন্তোষে ভরে আছে চারপাশ; কারণ রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ।

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close