logo

orangebd logo
সাইবার অপরাধে নারীরা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি
কাঞ্চন দত্ত

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় জান্নাতের সাথে তার সহপাঠী রাফিদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আস্তে আস্তে সম্পর্ক গভীর হয়। এক পর্যায়ে জান্নাত জানতে পারে রাফিদের সাথে আরেকটি মেয়ের সম্পর্ক আছে। এ কারণে জান্নাত রাফিদের সাথে সম্পর্ক ভেঙ্গে দিতে বাধ্য হয়। খুবই হতাশ হয়ে পড়ে সে। সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয় জান্নাত। কিছু দিন পর জান্নাতের বন্ধুরা জানায়, তার আর রাফিদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কিছু ভিডিও ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছে। বন্ধুদের কথা শুনে জান্নাতও ভিডিওটি দেখে। হতবাক হয়ে যায় সে। কখন এগুলো রেকর্ড করা হয়েছে জান্নাত সেটা বুঝতে পারেনি। লজ্জায়, ঘৃণায় লেখাপড়া বন্ধ করে দেয় সে।

জান্নাতের মতো অসংখ্য মেয়ে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। প্রযুক্তির কল্যাণে সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের অনেক সফলতা ও সুফল দিয়েছে। কিন্ত বর্তমানে প্রযুক্তির অপব্যবহার বেড়ে গেছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ছেলেমেয়ে উভয়ই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। তবে এ মাধ্যমে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের নানা রকম ঝুঁকি ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়। শৈশব থেকেই আমাদের সমাজে মেয়েরা নানা বাধা ও ঝুঁকি নিয়ে বেড়ে উঠছে তার ব্যতিক্রম নয় ভার্চুয়াল জগতেও। তাই প্রযুক্তির অপব্যবহারে নারীরা বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

সাইবার অপরাধের শিকার এখন স্কুল-কলেজের মেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়গামী তরুণী থেকে শুরু করে গৃহিণী, পেশাজীবী নারী, সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক, ব্যবসায়ীসহ সেলিব্রেটি নারীরাও। সাইবার অপরাধীরা অনলাইনের মাধ্যমে মেয়েদের ফেসবুক আইডি হ্যাক, ছবি দিয়ে ভুয়া আইডি খুলে আপত্তিকর ছবি, ভিডিও পোস্ট করে মেয়েদের বস্ন্যাকমেইল করছে। তাছাড়া ইদানীং সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে মেয়েদের ছবি দিয়ে ছেলেরাই মেয়েদের নামে আইডি খুলে ব্যবহার করছে। বিভিন্ন স্ট্যাটাস দিচ্ছে। এসব স্ট্যাটাসের সাথে দেখা যায় কোনো মেয়ের ছবি। অনেক ছেলেই না জেনেশুনে এসব ভুয়া আডির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে যে মেয়েটির ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। পাশাপাশি মেয়েদের ম্যাসেঞ্জারে নানা ধরনের অশীস্নল ছবি পাঠানোর ঘটনাও ঘটছে। সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে ফেসবুক। এ ছাড়া আছে ইউটিউব, টুইটারসহ নানা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। এ ম্যাধ্যমগুলোর সবটিতেই নারীরাই বেশি নির্যাতিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে দেশের কিশোর ও তরুণদের বড় একটা অংশ খুব সহজেই এসব সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে দিন দিন সাইবার অপরাধ বেড়েই চলেছে। কেবল অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে বস্ন্যাকমেল করা নয়, ইন্টরনেট ব্যবহর করে নিত্যনতুন অপরাধ করছে টিনএজ বয়সীরা।

সাইবার অপরাধ বলতে মূলত ইন্টানেট ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধকে বুঝায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পর্ক থাকাকালীন, জোরপূর্বক অথবা এডিটিংয়ের মাধ্যমে মেয়েদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। নানাভাবে হুমকি দিয়ে বস্ন্যাকমেইল করা হচ্ছে নারীদের। এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদের পরও দাম্পত্য জীবনের গোপন বিষয় ফেসবুকে প্রকাশ করা হচ্ছে। যেভাবে আমাদের সমাজ তথা দেশে সাইবার অপরাধ বাড়ছে এখনই তা দমন করা না হলে ভবিষ্যতে তা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

শুধু আমাদের দেশেই এমন ঘটনা ঘটছে তা কিন্তু নয়, এ সমস্যা সারা পৃথিবীতেই। ৮৬টি দেশে চালানো জাতিসংঘের এক জরিপের তথ্যে জানা যায, সারাবিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মোট নারীর তিন চতুর্থাংশ কোন না কোনভাবে সাইবার সহিংসতার শিকার হচ্ছে। সভ্য সমাজের জন্য এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। একজন নিরপরাধ মানুষকে শুধু মেয়ে হওয়ার জন্য সমাজের কিছু বিকৃত মানুষের দ্বারা হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হতে হবে তা মোটেই কাম্য নয়। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছি। উন্নয়নের সব সূচকে আমাদের সাফল্য আশাব্যঞ্জক। আর এর পেছনে রয়েছে নারীর বিরাট অবদান। দেশের সবচেয়ে বড় গার্মেন্টস শিল্প, সেখানেও প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ নারী কাজ করে থাকে। তাদের ত্যাগ ও ঘামঝরা শ্রমের বিনিময়েই আমাদের দেশের পোশাক খাত সারাবিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে বলেই বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নারীর সব অবদান একসাথে যুক্ত করলে সার্বিকভাবে দেখা যায় পুরুষের তুলনায় নারীর অবদান পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে বেশি ছাড়া কম হবে না। তারপরও নারীর নানাবিধ নির্যাতন খুবই বেদনাদায়ক। এখন সময় এসেছে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

সম্প্রতি ঢাকায় 'সাইবার সিকিউরিটি অ্যাওয়ারনেস ফর উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট' শীর্ষক কার্মশালায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে দেখা গেছে, দেশে সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া মানুষের একটি বড় অংশ অল্পবয়সী মেয়েরা। এতে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি। অল্প বয়সী মেয়েরা যখন কেউ সাইবার অপরাধের শিকার হয় অনেক সময় তারা বুঝতে পারে না কী করবে, কাকে জানাবে। অনেকে কাউকে জানায় না। নীরবে হয়রানির শিকার হতে থাকে। এসব হয়রানি ঠেকাতে এবং সাইবার অপারাধের শিকার হলে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করতে স্কুলগামী ছাত্রীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের এ কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী ৮টি বিভাগে ৪০টি স্কুল ও কলেজের প্রায় ১০ হাজার ছাত্রীকে সচেতন করার লক্ষ্যে কর্মশালার আয়োজন করা হবে।

গত বছরের জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি সোসাইটির উদ্যোগে ঢাবির পাঁচটি ছাত্রী হলে ২ হাজার ১ শত ছাত্রীর মধ্যে একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা যায় ৭৭ শতাংশ ছাত্রী ইন্টারনেটে ফেসবুককেন্দ্রিক বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। অশ্লীল দৃশ্য ধারণ করে ইন্টারনেটের ছেড়ে দেওয়ার মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। ইন্টারনেট মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করার পাশাপাশি এর অপব্যবহার নারীর জীবনে বয়ে এনেছে নানা ধরনের বিড়ম্বনা। এতে তারা মানসিক নির্যাতনের সাথে সাথে সামাজিকভাবেও হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তি আইনের সঠিক প্রয়োগের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। যার কারণে অনেক ভুক্তভোগী নারী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই তথ্য প্রযুক্তির যথাযথভাবে ব্যবহার করা একান্ত প্রয়োজন। প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকটা আমাদের গ্রহণ করা উচিত। ফেসবুকে ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ এটা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, ব্যক্তিগত নয়।

প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্ব এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। তথ্য প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ই-মেইল, ইন্টারনেট ব্যবহার হচ্ছে। যার ফলে সাইবার অপরাধ বাড়ছে। সাইবার অপরাধ বন্ধে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। এ ধরনের সামাজিক অপরাধ বন্ধ করার লক্ষ্যে সব ধরনের পর্নোগ্রাফি উৎপাদন এবং সরবরাহ নিষিদ্ধ করে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ প্রণয়ন করেছে সরকার। এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও অত্যন্ত তৎপর রয়েছে। অনেকেরই দ্রুত বিচার আইনে সাজা দেয়া হচ্ছে। তবে শুধু সরকারের পক্ষে এ সামাজিক অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পরিবারের ভূমিকাটাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকের উচিত প্রযুক্তির ভালো দিকটা গ্রহণ করা এবং খারাপ দিকটা বর্জন করা। সবাই সচেতন হলে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

(পিআইডি-ইউনিসেফ ফিচার)

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close