logo

orangebd logo
শিশুর জন্য মাতৃদুগ্ধ
মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

লেখাটা শুরু করতে গিয়ে নিজের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে আমার অবস্থান ছিল চতুর্থ। আমিই ছিলাম বাবা-মায়ের প্রথম পুত্রসন্তান। নিকট বড় বোন আমার মাত্র দুবছরের বড়। স্বাভাবিক কারণেই মায়ের কোল দখল করে নেয়া নতুন অতিথিকে আমার বোনটির সহজে মেনে নেয়ার কথা নয়। আমি যখন মায়ের দুধ পান করতাম অসহায় বোন তখন কটমট করে আমার দিকে তাকাতো, আর মায়ের কোল দখল করার চেষ্টা করতো। মা আমার বড় বোনকে আদর করে কোলে বসিয়ে তার অন্য স্তনটি মুখে পুরে দিতেন। আমরা দু'ভাই-বোন পরম আনন্দে মায়ের দুধ পান করতাম। কখনও তা সম্ভব না হলে আমার বড় আপা ও মেজদিদি আমার বোনকে কোলে নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতেন। আমার পরের বোনটি যখন জন্ম নেয় তখন আমার বয়স পাঁচ বছর ছাড়িয়ে গেছে এবং আমি মায়ের দুধ পান করা থেকে বিরত থেকে স্কুলগামী হয়েছি। ওর সাথে মাতৃদুগ্ধ পান করা নিয়ে কোন ঝামেলা হয়েছে বলে শুনিনি। অবশ্য সে সময়েও অনেক পাঁচ-ছয় বছরের সন্তানকে মায়ের গলা ধরিয়ে মায়ের শুকনো স্তনকে চুষতে দেখেছি। আমাদের মা-বাবার সাত সন্তানের মধ্যকার নিবিড় সম্পর্ক অনেকের কাছে এক বিরল দৃষ্টান্ত যা কিনা একই মায়ের দুধ পানের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে কিনা জানি না। একথা সত্য, মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্কের শুরু মাতৃগর্ভ থেকে। গর্ভে থেকেই মায়ের নাড়ির মাধ্যমে সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার পূর্ব পর্যন্ত পানাহার গ্রহণ করে এবং ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে। মা যেন তার জীবন উজাড় করে সন্তানকে মাতৃগর্ভে লালন করেন। তাই সন্তান গর্ভে আসার পরই মায়ের খাবারের প্রতি যত্নশীল হতে হয়। প্রয়োজন পড়ে তার মানসিক পরিচর্যার। সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার পরও মায়ের দুধ দিয়েই নবজাতকের এই পৃথিবীর প্রথম খাদ্যগ্রহণ শুরু হয়।

বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই মাতৃদুগ্ধ পান থেকে সন্তানকে বঞ্চিত করার অনেক ঘটনার কথা শোনা যায়। বুকের দুধ পান করালে নাকি মায়েদের দেহসৌষ্ঠব নষ্ট হয়ে যায় এমন ভ্রান্ত ধারণা অনেকের মনে কাজ করে। তারা জন্মের পর থেকেই শিশুকে কৌটাজাত দুধ ও অন্যান্য খাবার দেন। অথচ মায়ের স্তনে জমাকৃত প্রথম দুধ শিশুর জন্য রোগ প্রতিশেধক হিসাবে কাজ করে। এ থেকে শিশু বঞ্চিত হলে শিশুর যেমন শারীরিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে এসব শিশু নানা রোগের শিকার হতে পারে। আজকাল কর্মজীবী মায়েরা তাদের বেশির ভাগ সময় ঘরের বাইরে থাকেন। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, নানা সামাজিক কর্মকা-ে আজকাল মেয়েরা এতো ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে, অনেকক্ষেত্রে গৃহকর্মীর ওপর সন্তানের দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চান। কখনও তাদের সদ্যজাত সন্তানকে শিশুপালন কেন্দ্রে বা চাইল্ডহোমে পাঠাতে বাধ্য হন। বাংলাদেশেও কিছু কিছু স্থানে ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে উঠেছে। সবক্ষেত্রে সেগুলো মানসম্মত না হলেও সেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সন্তানকে রেখে মায়েরা তাদের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করতে পারেন। অনেক ডে-কেয়ার সেন্টারে মায়েদের ব্রেস্টফিডিংয়ের সুযোগ নেই। ফলে মায়েদের সন্তানকে সারাদিন মাতৃদুগ্ধ পান করানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। বাংলাদেশে যেসব স্থানে ডে-কেয়ার সেন্টার নেই সেসব স্থানের কর্মজীবী নারীদের পড়তে হয় আরও বিপাকে। ফলে এসব সন্তানরা মায়ের দুধ পান করা থেকেই শুধু বঞ্চিত হয় না মায়ের যথেষ্ট পরিমাণ মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা তারা পায় না। শুধু কৌটাজাত দুধ পান করে তারা বড় হতে থাকে। গার্মেন্টস কর্মীর মতো নিম্নবিত্তের কর্মজীবী নারীদের অবস্থা আরও করুণ। তাদের সন্তানকে অন্যের পাহারায় ঘরে রেখে যেতে বাধ্য হন। তাদের সন্তানদের তো আর ডে-কেয়ার সেন্টারে পাঠানোর মতো সম্বল নেই। অনেকক্ষেত্রে তারা এটা চানও না। তাদের ঘরের অন্য মেয়েরা বা কখনও সন্তানের বাবাই অবসরে শিশুটির দেখাশোনার ভার নেন। অনেক নারী ফিডিং বোতলে মায়ের দুধ ভরে রেখে যান যা থেকে সময়মতো শিশুকে কিছু হলেও মায়ের দুধ পান করানো সম্ভব হয়। স্বাস্থ্যবিজ্ঞান মতে, এঙ্ক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং অর্খাৎ জন্ম থেকে শিশুর ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের শুধু মায়ের দুধ পান করানো জরুরি।

সারা বিশ্বের মতো নানা আয়োজনে এবারেও বাংলাদেশে ১ থেকে ৭ আগস্ট পালিত হচ্ছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ-২০১৭। এ বছরের বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য 'মাতৃদুগ্ধ পান টেকসই করতে ঐক্যবদ্ধ হই'। শিশুর জন্য মায়ের দুধ পান করা যে কত জরুরি সেই বিষয়ে ব্যাপক প্রচারের জন্য সারা বিশ্বের নারীদের উৎসাহিত করতেই মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালনের শুভসূচনা। ১৯৮১ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ইন্টারন্যাশনাল কোড অব ব্রেস্ট সাবস্টিটিউট অনুমোদন লাভ করে। এরপর থেকে মায়ের দুধের প্রতি প্রাধান্য বাড়ানোর লক্ষ্যে এর বিকল্প পণ্যের প্রচার বন্ধে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশনসহ সকল গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক এই কোডের গুরুত্বের দিক বিবেচনা করে সর্বত্র নজরদারি বৃদ্ধিতে চালু হয় ইন্টারন্যাশনাল বেবি ফুড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক। পরবর্তীতে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ সংক্রান্ত আরও বহু কার্যক্রম গৃহীত হয়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে এসব পরিকল্পনা কার্যকর হলেও নানা কারণে অদ্যাবধি শিশুর জন্য মাতৃদুগ্ধের প্রয়োজনীয়তা সেভাবে প্রচার পায়নি। অনেক ক্ষেত্রে এ বিষয়ে মায়েদের উপলব্ধির ঘাটতি রয়েছে। সে যা হোক, প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন যৌথভাবে সপ্তাহটি উদযাপন করে। সব মা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন তার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করাই মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহে পালনের প্রধান উদ্দেশ্য। সে লক্ষ্যে এঙ্ক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং এর আওতায় সব মায়েদের আনার জন্য সরকারি বেসরকারি দফতরসহ হাসপাতাল, টার্মিনাল, স্টেশন, সকল পাবলিক প্লেসে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার চালু করার সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলেও তা পুরোপুরি চালু হয়নি। কিছু কর্নার চালু হলেও তা ব্যবহার উপযোগী না হওয়ায় এবং অনেকের বিষয়টি সম্পর্কে না জানার কারণে মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে মায়েদের এ ব্যাপারে উৎসাহের অভাবেও আসল উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। কর্মস্থলে ডে-কেয়ার না থাকার এবং সেন্টারে ব্রেস্টফিডিংয়ের সুব্যবস্থার অভাবেও অনেক শিশু মায়ের দুধ পান ও যত্ন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে অফিস ব্যবস্থাপক, মিলকারখানার মালিকদের এগিয়ে আসতে হবে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। দিনেদিনে বেড়ে শিশুরাই বয়স্ক মানুষে পরিণত হয়। সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেড়ে উঠে অনুকূল পরিবেশ পেলে ধীরে ধীরে শিশুমনে মুক্তচিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটে। বিদ্যা-বুদ্ধি-মননে, প্রগতিশীলতায় সমৃদ্ধি লাভ করে। দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা অর্জনেও সক্ষম হয়। সমাজ গঠনে রাখতে পারে সক্রিয় ভূমিকা। শিশুকে মায়ের দুধ পান না করিয়ে শুধু কৌটাজাত দুধের ওপর নির্ভরশীল হলে শিশুপুষ্টিহীনতার শিকার হবে, এমনকি শারীরিক মানসিক ভাবেও বিকশিত হতে পারবে না।

তথ্য সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে সন্তান জন্ম দিতে প্রতি লাখে ৩২২ জন মা মারা যেতেন। ২০১৬ সালে তা ১৭০ জনে নেমে এসেছে। নবজাতক ও শিশুমৃত্যুর হারও কমে এসেছে। ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের অপুষ্টির হারও হ্রাস পেয়েছে। এসব সম্ভব হয়েছে মাতৃদুগ্ধ পানের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে। বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মায়েরা ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করতে পারেন। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় মায়েদের এতদিন ছুটি দেয়া হয় না। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারি সকল ধরনের প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটির সমতা আনা জরুরি। তাহলে শিশুদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ছয় মাসের জন্য মাতৃদুগ্ধ পান করার অধিকার ধেকে শিশুরা বঞ্চিত হবে না। পাশাপাশি সকল ধরনের প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনসহ ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার চালু রাখার ব্যবস্থা করা উদ্যোগ কার্যকর করতে হবে। কেননা মায়ের দুধ পান করা শিশুর জন্য কোন বিশেষ সুবিধা নয়, সেটা শিশুর জন্মগত অধিকার। শিশুর সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক শুধু দেহের নয়। রয়েছে এক আত্মিক, স্বর্গীয় সম্পর্ক। দশ মাস গর্ভে থেকে যে শিশু মায়ের দেহের সব সারবস্তু খেয়ে গতরে বড় হয়, সেই নাড়িছেঁড়া ধন জন্মলাভের পর মায়ের বুকের দুধ পানে বঞ্চিত হবে, তা একটি প্রকৃতি বিরুদ্ধ কল্পনা। মাতৃদুগ্ধ পানের মাধ্যমেই মায়ের সাথে শিশুর যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা থাকে আমৃত্যু। এ সম্পর্ককে অস্বীকার বা অবহেলা করে শিশুকে মায়ের দুধ পান থেকে বঞ্চিত করা এক কথায় অমানবিক।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও গল্পকার]

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close