logo

orangebd logo
মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হবে
শান্তা মারিয়া

একটু কিছু হলেই উদ্বেগে বা টেনশনে ভুগতে থাকেন ফয়জুননেসা খাতুন। স্বামী অফিস থেকে ফিরতে দেরি করছে, কিংবা সন্তান গেছে বন্ধুর বাড়িতে অল্প সময়ের জন্য, ব্যস টেনশন শুরু হয়ে গেল। দিনে বা রাতে কারণে অকারণে টেনশন শুরু হয়ে যায় তার। স্বামী ও সন্তানরা বিরক্ত হয়। তাকে নিষেধ করে টেনশন না করতে। এভাবে দিন কাটতে থাকে। এক সময় খাওয়া-দাওয়া কমে যেতে থাকে ফয়জুননেসার। ধীরে ধীরে তিনি দৈনন্দিন কাজকর্ম করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলতে থাকেন। রাতে ঘুম কমে যায়। রাতে শুধু হাঁটাহাঁটি করেন, রান্নাঘরে চুলা বন্ধ কি-না, ঘরের মেইন দরোজা বন্ধ কি-না বারে বারে দেখেন। তার এই উদ্বেগ এত বেড়ে যায় একসময় যে তার স্মৃতিশক্তিও লোপ পেতে থাকে। চিকিৎসক দেখানো হয়। সাধারণ চিকিৎসক তাকে মানসিক রোগের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে বলেন। ফয়জুননেসাকে মানসিক চিকিৎসক পরীক্ষা করেন। দেখা যায় তার একটি বিশেষ ধরনের মানসিক রোগ হয়েছে। এই রোগে ভুগলে অহেতুক উদ্বেগ দেখা দেয়।

শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদিও অনেক সময় মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি আমরা তেমন গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করি না। টেনশন, ডিপ্রেশন, ইত্যাদি নানা রকম মানসিক রোগ কিন্তু আমাদের চারপাশের মানুষের মধ্যে থাকতে পারে। দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী কোন ব্যক্তি যে কোন সময় মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

এ বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস এর প্রতিপাদ্য ছিল 'বিষণ্নতা নিয়ে আসুন কথা বলি।' মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে এই প্রতিপাদ্য। সারা বিশ্বে ৫ থেকে ১৭ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছে। ১৭টি রাষ্ট্রে পরিচালিত ওয়ার্ল্ড মেন্টাল হেলথ সার্ভের প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতি ২০ জন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী পুরুষের মধ্যে ১ জন বিষণ্নতায় ভুগছে। বাংলাদেশে প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত। শিশুদের মধ্যেও ১ শতাংশ বিষণ্নতায় ভুগছে। দেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত। বাংলাদেশে পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে বিষণ্নতার হার প্রায় দ্বিগুণ। বিষণ্নতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উৎপাদন, সৃজনশীলতা এবং অন্যান্য কাজ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী সারা বিশ্বে প্রতিদিন তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। বছরে প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। এইসব আত্মহত্যার বেশিরভাগই ঘটে বিষণ্নতার কারণে।

শুধু বিষণ্নতা নয় উদ্বেগ, স্কিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক রোগও রয়েছে। জাতীয় জরিপ অনুযায়ী দেশের ১৮ বছরের বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ১৬ শতাংশ এবং ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুকিশোরদের ১৮ শতাংশ মানসিক রোগে ভুগছে। তবে দেশে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ আছেন মাত্র ২২০ জন। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে অন্য জনবলও অপ্রতুল।

মানসিক রোগ নিয়ে আমাদের সমাজে বেশ কিছু কুসংস্কার রয়েছে। ভূত-প্রেত বা জিনের আছরের কারণে রোগী অস্বাভাবিক আচরণ করছে এমনটি হরহামেশাই মনে করা হয়। অনেক সময় মানসিক রোগীকে ওঝা বা হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। পানিপড়া, ঝাড়ফুক ইত্যাদির মাধ্যমে রোগীকে আরোগ্য করার চেষ্টা করা হয়। ফলাফল আরও খারাপ হয়। রোগ তো ভালো হয়ই না উল্টো রোগীর জীবন সংশয় দেখা দেয়। মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে বিশেষ করে নারীরা বেশি সামাজিক সমস্যায় পড়েন। বিবাহিত নারী যদি মানসিক রোগে আক্রান্ত হন তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্বশুরবাড়িতে তার যথাযথ চিকিৎসা না করে বরং তালাক দেয়া হয় অথবা বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

অনেক সময় মানসিক রোগী ছেলেকে সুস্থ করার আশায় কোন সুস্থ মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়। যার ফলে সেই মেয়েটির জীবনও নষ্ট হয়ে যায়। সাধারণত নারীদের বা টিনএজ ছেলেমেয়েদের এমন সমস্যায় অভিভাবকরা অনেক সময় কড়া ব্যবহার করেন। যা রোগীকে আরও অসহায়ত্বের মধ্যে ঠেলে দেয়।

মুশকিল হলো মানসিক রোগের চিকিৎসা কেবল ওষুধ নির্ভর নয়। অনেকটাই কাউন্সেলিং নির্ভর। কাউন্সেলিং দেয়ার মতো যথেষ্ট সংখ্যক মনোচিকিৎসক বাংলাদেশে নেই। জাতীয় বাজেটে মানসিক চিকিৎসা খাতের বরাদ্দ হলো ০.৪ শতাংশ যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকই কম। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং কল কারখানায়, অফিসে, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন কাউন্সেলিং সেন্টার। ছাত্র শিক্ষকদের মানসিক সাহায্য, পরামর্শ দেয়ার জন্য কাউন্সেলিং সেন্টারে প্রশিক্ষিত কর্মী থাকতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য চেক আপের পাশাপাশি মানসিকভাবে কেউ কোনো অস্বস্তিতে ভুগছে কিনা সেটিও যদি চেকআপ হয়, পরামর্শ দেয়া হয় তাহলে অনেক অপমৃত্যু আমরা রোধ করতে পারব।

ছোটখাটো সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে হয়তো কর্মীদের নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। তাই মতিঝিল, কারওয়ান বাজারের মতো বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে সরকারি উদ্যোগে এ ধরনের কাউন্সেলিং কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। কারণ মানসিক স্বাস্থ্যও কিন্তু নিয়মিত চেক আপ করতে হয়। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর জন্যও কাউন্সেলিং প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে। পারিবারিক নির্যাতনের কারণে অনেক নারী বিষণ্নতাসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। আক্রান্ত হতে পারে শিশুরাও। তাদের সবার জন্যই দরকার কাউন্সেলিং। যেসব নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হন তাদের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে কাউন্সেলিং দরকার।

গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের পর নারীরা এক বিশেষ ধরনের বিষণ্নতা বা বস্নুজ এ আক্রান্ত হতে পারেন। মেনোপজের আগে বা পরেও বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন অনেক নারী। হরমোন সংক্রান্ত কারণেই এমনটা ঘটে। দেখা দিতে পারে অন্য ধরনের মানসিক সমস্যাও।

মানসিক সমস্যার সঙ্গে শুধু শারীরিক নয়, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কারণও জড়িয়ে থাকে। ক্যারিয়ারের টানাপোড়েন, পারিবারিক সংকট, বেকারত্ব, অসুস্থতা, পরিবারের কোনো সদস্যের অসুস্থতা, আর্থিক সংকট, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিশাল ব্যবধান মানুষকে হতাশাগ্রস্ত ও বিষণ্ন করে তুলতে পারে। অন্য ধরনের মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে এইসব কারণে। মেজাজ হয়ে উঠতে পারে কর্কশ বা খিটখিটে। আবার ডিমেনশিয়া আলঝেইমার ইত্যাদি রোগও হতে পারে বংশগত কারণে। এগুলোকে অনেক সময় প্রাথমিক অবস্থায় রোগ বলে চিহ্নিত করা হয় না। ফলে দিনে দিনে রোগটি বেড়ে যায়। চলে যায় আয়ত্তের বাইরে। অথচ প্রাথমিক অবস্থায় মানসিক রোগের যথাযথ চিকিৎসা হলে রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ মানুষকে সাহায্য করতে পারে। বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগ থেকে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচানো দরকার। কারণ যারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে তারা যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বাস্থ্যবান না হয় তাহলে কিভাবে আমরা দেশের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত হবে?

আমাদের প্রতিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র, সরকারি ও বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতালে দরকার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ ও চিকিৎসা কেন্দ্র। এই বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত প্রচুর চিকিৎসক ও কর্মী প্রয়োজন। মানসিক রোগের কারণে যেন কোন সম্ভাবনাময় জীবন ঝরে না যায়, হারিয়ে না যায় অন্ধকারে সেটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন অবিলম্বে।

(পিআইডি-ইউনিসেফ ফিচার)

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close