logo

orangebd logo
১৬ জুলাই বাঙালির ইতিহাসের কলঙ্কিত দিন
মোহাম্মদ শাহজাহান

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে পিতার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ কঠিন রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাবলি অনেক কাছ থেকেই দেখেছেন। আমি একটি কথা মনের বিশ্বাস থেকে জোরের সঙ্গে অনেকবার লিখেছি_ 'বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে এত বেশি অতুলনীয় রাজনৈতিক গুণাবলি ছিল, যা বিশ্বের আর কোন রাজনীতিবিদের মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না।' শেখ হাসিনা দেখেছেন, ২৩ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে কীভাবে শেখ মুজিব পাকিস্তানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন। ৫৫ বছরের জীবনে শেখ মুজিব যে কতবার গ্রেফতার হয়েছেন, এই পর্যন্ত সঠিকভাবে কেউ তা বলতে পারেনি। কারাগার ছিল এই নেতার দ্বিতীয় বাসভবন। গ্রেফতার এড়াতে কোনদিন স্বল্প সময়ের জন্যও শেখ মুজিব আত্মগোপন করেননি। কারাগারের জন্য একটি ছোট্ট বেডিং সব সময় প্রস্তুত থাকত। বাংলার মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কীভাবে হাসতে হাসতে দু-দু'বার ফাঁসির মঞ্চ বেছে নিয়েছেন, কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনা তা কাছ থেকেই দেখেছেন।

১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার কিভাবে একটি দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, কালের ইতিহাসে তা সাক্ষী হয়ে আছে। লায়ালপুর জেলে ৪১ সেলের পাশে কবর খোড়া হয়েছিল, শেখ মুজিব মাথা নত করেননি। শুধু বলেছেন, 'ফাঁসির পর আমার লাশটা তোমরা আমার বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিও।' ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি হিসেবে আইয়ুব-মোনায়েম চক্র ফাঁসিতে ঝোলাতে চেয়েছিল শেখ মুজিবকে। মুজিব পরোয়া করেননি। মাত্র কিছুদিন আগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত আসামি একজন সেনা কর্মকর্তা এক সাক্ষাৎকারে জানান, ১৯৬৮-৬৯ সালে যখন ফাঁসির গুঞ্জন চলছিল শেখ মুজিব হাসতে হাসতে বহুবার বলেছেন, 'শেখ মুজিবকে কারো ফাঁসি দেয়ার ক্ষমতা নেই।' ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার শেষে বঙ্গবন্ধু বললেন, 'আপনারা আমাকে রক্ত দিয়ে মুক্ত করেছেন। রক্ত দিয়েই আপনাদের রক্তের ঋণ শোধ করব।' মুজিব কথা রেখেছেন। শুধু তাঁর নিজের রক্তই দেননি, ১৫ আগস্ট স্ত্রী, তিন পুত্র, ২ পুত্রবধূসহ আত্মীয় স্বজনদের রক্ত দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর মতো শেখ হাসিনাও বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য জীবনদানে প্রস্তুত। আর এজন্যই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে শেখ হাসিনা ২০০৭ সালে লন্ডন ও আমেরিকা থেকে স্বদেশে ফিরে আসেন। দেশে না আসার জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যাকে খুনের মামলা ও চাঁদাবাজির মামলার আসামি করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়, 'রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি' ঘোষণা করে নেত্রীর আসার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়; কিন্তু এসব কিছুকে পাত্তা দেননি নেত্রী। তাঁর এক কথা_ 'জেল-জুলুম ফাঁসির দড়ি কোনো কিছুকেই আমি পরোয়া করি না। এই দেশ আমার। আমার মানুষের কাছে আমি ফিরে যাবই।' ২০০৭ সালের ১৮ এপ্রিল জারি করা নিষেধাজ্ঞা এক সপ্তাহের মাথায় ২৫ এপ্রিল সরকার প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ৭ মে ২০০৭ শেখ হাসিনা বীরবেশে দেশে ফিরেন।

দেশে ফেরার চরম পরিণতির কথা জানতেন শেখ হাসিনা। খুনের মামলা থেকে শুরু করে এক ডজনের বেশি মামলা দায়ের করা হয় নেত্রীর বিরুদ্ধে। অবশেষে ১৬ জুলাই ২০০৭ ভোর রাতে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৬ জুলাই কি ঐতিহাসিক দিন, নাকি কলঙ্কিত দিন সেই বিচারের ভার ইতিহাসের ওপরই রইল। কলঙ্কিত দিন এ জন্য যে, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্যই ছিল ওই ষড়যন্ত্রমূলক গ্রেফতার। ২০০৭ সালে নির্বাচন হলে শেখ হাসিনা বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হতেন।

শুধু শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে রাখার জন্যই ১৬ জুলাই নেত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তিন কর্ণধার তিনজনই ছিলেন বিএনপি ও খালেদা জিয়ার কাছের মানুষ। খালেদা জিয়াই ফখরুদ্দীন আহমদকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, কয়েকজন জেনারেলকে ডিঙ্গিয়ে মইন ইউ আহমদকে সেনাপ্রধান এবং বিএনপি দলীয় শিক্ষক প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহাম্মদকে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করেছিলেন। কাজেই বিএনপি জোটের পর খালেদা সমর্থক তিন কুচক্রীই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে।

ফখরুদ্দীন গং ক্ষমতা দখল করেই মাইনাস-টু এর মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে ৫/৭ বছরের জন্য অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনো চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের কাছেই শেখ হাসিনা মাথানত করেননি। ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন-ইয়াজউদ্দিনের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চক্রান্ত বঙ্গবন্ধুকন্যা জেলে থেকেই ব্যর্থ করে দেন।

১৬ জুলাই কি পরিস্থিতিতে নেত্রীকে গ্রেফতার করা হয় তা জানার জন্য এর আগের কিছু ঘটনাবলি এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে ৫ বছর বেশ ভালোভাবেই দেশ পরিচালনা করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। অনেকের মতে, ওই ৫ বছরকে স্বাধীনতা-উত্তর চার দশকের 'স্বর্ণযুগ' বলা যায়। ২০০১ সালে লতিফুর রহমানের ষড়যন্ত্রের নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতীদের নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন বেগম খালেদা জিয়া। তখন বেগম জিয়া একাত্তরের দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী নিজামী ও মুজাহিদকে কেবিনেট মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ প্রদান এবং উচ্চ আদালতে বিচারাধীন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার ৫ বছর আটকে রাখেন। বিএনপি জোট হারবে এবং নিশ্চিতভাবেই মহাজোট জিতবে_ এই ধারণা থেকেই নির্বাচন বানচাল করে ওয়ান-ইলেভেন অনিবার্য করে তোলেন খালেদা গং।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে ক্ষমতার বাইরে রাখার জন্যই স্বাধীনতাবিরোধী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারি ফখরুদ্দীনদের ক্ষমতায় বসায়।

কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই অবশেষে ২০০৭-এর ১৬ জুলাই সোমবার ভোররাতে স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দেশের সর্ববৃহৎ দল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। চরম উত্তেজনা, বাকবিত-া ও নেতাকর্মীদের অবিরাম জয় বাংলা সেস্নাগানসহ প্রচ- হৈ চৈ-এর মধ্যে খুবই দ্রুততার সঙ্গে তাকে শেরে বাংলানগরে একটি উপ-কারাগারে ঐদিন সকালেই প্রেরণ করা হয়। ১৩ জুন জনৈক আজম জে. চৌধুরীর গুলশান থানায় দায়ের করা একটি সাজানো চাঁদাবাজির মামলার আসামি দেখিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। অবশ্য বেশ কিছুদিন থেকেই শেখ হাসিনা বন্দী জীবন যাপন করছিলেন। তার সঙ্গে নিকটাত্মীয় ছাড়া অন্য কাউকে দেখা করতে দেয়া হয়নি। বেগম মতিয়া চৌধুরীর মতো একজন জাতীয় পর্যায়ের নেত্রীকে সুধা সদনের গেটে অনেকটা অসহায়-এতিমের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।

১৬ জুলাই সোমবার ভোরের অন্ধকার তখনো কাটেনি। ৫টা বাজতে ১৫ মিনিট বাকি। একের পর এক গাড়ি আসছে। গন্তব্যস্থল শেখ হাসিনার স্বামীর আবাসস্থল সুধা সদন। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শতাধিক গাড়ি ভবনটি ঘিরে ফেলে। কেউ কেউ ছিলেন সাদা পোশাকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা। এ সময় বুটের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ধানম-ি পাঁচ নম্বরের ৫৪/এ নম্বর বাড়ির বাসিন্দাদের। সাংবাদিকরা এই গ্রেফতারের তোড়জোড়ের কথা আগেই টের পেয়ে যান। মধ্যরাত থেকে সুধা সদনের আশপাশে সাংবাদিক এবং ফটোসাংবাদিকদের ভিড় বাড়তে থাকে।

নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য দ্রুত সুধা সদনে ঢুকে পড়েন। তারা বাড়ির নিরাপত্তা রক্ষীদের জানিয়ে দেন তাদের আগমনের উদ্দেশ্য। নেত্রী তখন ফজরের নামাজ আদায় করার প্রস্তুতি নিচ্ছেলেন। তিনি তাদেরকে নিচে অপেক্ষা করতে বলেন। এরই মধ্যে টেলিফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ভবনে নিয়োজিত নিরাপত্তা কর্মী এবং স্টাফদের নিচতলার একটি কক্ষে জমায়েত করা হয়। জব্দ করা হয় তাদের প্রত্যেকের মোবাইল সেট। নামাজ শেষ করে পুত্র জয়, কন্যা পুতুল, আইনজীবীসহ কয়েকজনের সাথে শেখ হাসিনা তখন মোবাইল ফোনে কথা বলেন। ডেইলি স্টার (১৭.৭.০৭-এর) তথ্য অনুযায়ী তার নিষেধ সত্ত্বেও যৌথ বাহিনীর কয়েকজন সদস্য উপরে উঠলে তিনি প্রথমে কিছুটা উত্তেজিত হন। কিছুক্ষণ পরই শেখ হাসিনা তাদেরকে চা-বিস্কুট খেতে দেন। মোবাইলে নেত্রী সর্বশেষ ফোনটি করেন তৎকালীন তথ্য ও আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে। ফোনে উপদেষ্টাকে বলেন, 'এসব কি হচ্ছে? আমি খুব শীঘ্রই মুক্ত হয়ে আসব। তখন আপনারা কেউ রেহাই পাবেন না। এমনকি আপনিও। অতীতে আপনি সহযোগিতার জন্যে আমার কাছে এসেছেন। ভবিষ্যতেও আপনাকে আমার কাছে আসতে হবে।' এরপরই শেখ হাসিনার সেল ফোনটি জব্দ করা হয়।

গ্রেফতারের পর সুধা সদন থেকে বের হওয়ার পূর্বে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি লিখেন শেখ হাসিনা। চিঠিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখ হাসিনা দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান। আমৃত্যু জনগণের পাশে থাকার অঙ্গীকার করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাব। তবে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের জন্য শতাধিক গাড়ি বহর নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকশ সদস্য সুধা সদনে যেভাবে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন, '৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাতে জাতির পিতাকে গ্রেফতার করতে পাকিস্তানি বাহিনীর কিন্তু এত লোকের প্রয়োজন পড়েনি। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে শেখ হাসিনাকে নিয়ে ১২টি গাড়ির একটি বহর আদালতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। এই অল্প সময়ের মধ্যেই খবর পেয়ে নেতাকর্মীরা আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় করেন। ৮টা বাজার আগেই নেত্রীকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে দেয়া ৩৫ মিনিটের বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, 'তাকে নির্বাচন করতে না দেয়ার জন্যই এই সাজানো মামলা দায়ের হয়েছে।' শেখ হাসিনার আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, একটি তুচ্ছ মামলায় শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদেরকে আদালতে প্রবেশে বাধা দিয়েছে। এমনকি তাদেরকে কথা বলতেও দেয়া হয়নি। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাকে তারা মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে উল্লেখ করেন। নেতাকর্মীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে বেলা ১০টা ৩৫ মিনিটে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে আদালতের নির্দেশে জেল-হাজতে নেয়া হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই গ্রেফতারে তাৎক্ষণিকভাবে দেশে-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ হয়। এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ, মিছিল, সমাবেশ ও ভাঙচুর করা হয়। গ্রেফতারের পর থেকেই দেশ-বিদেশে প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু হয়। গ্রেফতারের পর পর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রবীণ জননেতা জিল্লুর রহমান শেখ হাসিনার গ্রেফতারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, 'মাইনাস টু ফর্মূলা বাস্তবায়নের জন্যই এই গ্রেফতার।' অবিলম্বে নেত্রীর মুক্তি দাবি করে তিনি বলেন, 'জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যই উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই গ্রেফতার করা হয়েছে।' তিনি বলেন, 'কোনো সমন না পাঠিয়ে এই ধরনের গ্রেফতার দেশের সর্বস্তরের মানুষকে বিক্ষুব্ধ করেছে। পক্ষে-বিপক্ষের কেউ এটিকে সহজে মেনে নিতে পারেনি।' সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, 'যখন সংস্কারের জিগির উঠেছে তখনই আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে গ্রেফতার করা হলো। কারণ শেখ হাসিনা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করলে সংস্কারবাদীরা ঠাঁই পাবে না। তাই সংস্কারের সঙ্গে এই আটকের সম্পর্ক রয়েছে।' দলের প্রধান নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেছেন, সরকারের এ ধরনের অতর্কিত আক্রমণে তিনি বিস্মিত ও মর্মাহত হয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, আইনজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ শেখ হাসিনার গ্রেফতারের প্রতিবাদ ও নিন্দা করেন। শেখ হাসিনার গ্রেফতারের দু'দিন পর ১৮ জুলাই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এক বিবৃতিতে শেখ হাসিনার মুক্তি দাবি করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিবৃতিতে বলেন, 'একটি দলের প্রধান, একজন জাতীয় নেতার কন্যা, সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান নারী, সর্বোপরি দেশের একজন সম্মানিত নাগরিক হিসেবে আদালত প্রাঙ্গণে শেখ হাসিনাকে যে ধরনের অসম্মানজনক ও অশোভন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে, তাতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। আমার ধারণা, বিবেকবান নাগরিকদের অনুভূতি এতে আহত হয়েছে এবং দেশে-বিদেশে ক্ষুণ্ন হয়েছে সরকারের ভাব-মর্যাদা। সরকার আরও সতর্ক ও সচেতন থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো বলে আমার বিশ্বাস।'

শেখ হাসিনার গ্রেফতারের খবর বিশ্ব মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করে। বিবিসি, সিএনএন, এফপি, এপি, আল জাজিরা, সিনহুয়ার মতো বার্তা সংস্থায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। এএফপির সংবাদ শিরোনাম ছিল, 'বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার নতুন শত্রু সেনাসমর্থিত সরকার'। এএফপি'র সংবাদে বলা হয়, এর আগে সেনাসমর্থিত সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। পরবর্তীতে এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। আল জাজিরার সংবাদ শিরোনাম ছিল, 'দু'সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবারও লক্ষ্যবস্তু, হাসিনা গ্রেফতার'। আল জাজিরার রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়, 'রাজনীতি হতে দু'সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে অপসারণের লক্ষ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার অগ্রসর হচ্ছে।' সিনহুয়া লিখেছে, 'শেখ হাসিনা গ্রেফতার, সমর্থকদের বিক্ষোভ।'। এশিয়ার বৃহত্তম মানবাধিকার সংগঠন এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস শেখ হাসিনার গ্রেফতারে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানায়, 'এই গ্রেফতার ষড়যন্ত্রমূলক। আওয়ামী লীগ থেকে শেখ হাসিনাকে অপসারণের লক্ষ্যেই এই গ্রেফতার করা হয়েছে।' বিবিসি'র প্রতিবেদনে বলা হয়, 'শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের পর দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ সরকারের চাপে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের নেত্রীকে ভুলে থাকবে নাকি সহিংস বিক্ষোভের মাধ্যমে তা মোকাবেলা করবে_ তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।' বিবিসি'র রিপোর্টে বলা হয়, 'এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থিরা শিরোনাম হওয়া ছাড়া কাজের কাজ কিছুই করতে পারেননি। দলের সংস্কারপন্থি এই নেতারা মাঠ পর্যায়ে সাড়া ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে।' রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা বাইরে থাকলে সংস্কারপন্থিদের এই লড়াইয়ে পরাজয় নিশ্চিত। এ কারণেই সরকার তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে গ্রেফতার করেছে।' ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেননের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি বলেছে, 'যেভাবে শত শত নিরাপত্তাকর্মী শেখ হাসিনার বাড়ি ঘিরে রেখে তাকে গ্রেফতার করেছে, তাতে মনে হয় আমরা যুদ্ধাবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।' যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম সিএনএন-এর রিপোর্টে বলা হয়, 'অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, সরকার আগুন নিয়ে খেলছে এবং শেখ হাসিনার গ্রেফতার সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে।'

ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার শেখ হাসিনার গ্রেফতারকে সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত এবং অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে বলেছে, 'এই গ্রেফতার রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিবে এবং সংঘাতের পথ তৈরি হবে।' পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়, 'আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে, সরকারকে অবশ্যই তা ব্যাখ্যা করতে হবে। এই গ্রেফতার দেশের গণতন্ত্রের ব্যাপারে জনগণের কাছে ভুল বার্তা পেঁৗছাবে। দেশের সবচেয়ে প্রাচীন দৈনিক সংবাদ তাদের সম্পাদকীয়তে বলেছে, 'এই গ্রেফতার সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে না।' দৈনিক প্রথম আলো 'আইনকে তার নিজস্ব পথে চলতে দিতে হবে' শীর্ষক সম্পাদকীয়তে বলেছে, '...অনেকেই এখন বলতে পারেন, গত পাঁচ বছর লুটপাটের রাজত্ব করলেন খালেদা জিয়া, আর গ্রেফতার হলেন শেখ হাসিনা। এর জবাবও সরকারকে যৌক্তিকভাবে দিতে হবে।... সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত মুখগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। নইলে এমন এক দুর্ভাগ্যজনক বিভাজন রেখা তৈরি হতে পারে, যা চূড়ান্ত বিচারে সংস্কারের মূল চেতনাকেই দুর্বল করবে।'

আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থি নেতাদের ধারণা ছিল, শেখ হাসিনা গ্রেফতার হলে তারা সুবিধা করতে পারবেন। কিন্তু শেখ হাসিনা গ্রেফতারের পর পরিস্থিতি ভিন্ন আকার ধারণ করে। সংস্কারপন্থি কয়েকজন নেতা ছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ের প্রায় শতভাগ নেতাকর্মীর ধারণা ও বিশ্বাস, সংস্কারপন্থিদের সুবিধা করে দিতে তাদের প্ররোচণাতেই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শেখ হাসিনার গ্রেফতারের পর সুধা সদন নীরব হয়ে গেলেও দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানের বাসভবনে প্রতিদিন নেতাকর্মীদের ভিড় বাড়তে থাকে। দলের নেতাকর্মীরা সংস্কারপন্থিদের প্রতি বিভিন্নভাবে তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

প্রবীণ কলাম লেখক-সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ঐ সময় লিখেন, "হাসিনার জন্য এই গ্রেফতার শাপে বর হয়ে দেখা দিতে পারে, তিনি নেতৃত্বের অগি্ন পরীক্ষায় উতরে গেলেন। বলা হয়, ক্রাইসিসেই নেতৃত্বের চরিত্র ও শক্তির পরিচয়। বর্তমানে দল ও তার নেতৃত্বের জন্য যে চরম ক্রাইসিস চলছে, সাহসের সঙ্গে তার মোকাবেলা করে শেখ হাসিনা প্রমাণ করলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের যোগ্য উত্তরসূরি। বঙ্গবন্ধু যেভাবে পাকিস্তানের কারাগারে নয় মাস বন্দি থেকেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন, শেখ হাসিনাও তেমনি জেলেই থাকুন আর জেলের বাইরেই থাকুন, এবার বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে মুক্ত করার সংগ্রামে সাহসী নেতৃত্ব দেবেন। প্রমাণিত হলো, বাংলাদেশের এত নেতা, হাফ নেতা, পাতি নেতা থাকতে প্রকৃত নেতা আছেন একজনই তিনি শেখ হাসিনা। (জনকণ্ঠ, ১৭.৭.০৭)

এর পরের ইতিহাস সকলের জনা। কোনো চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রই শেখ হাসিনাকে থামাতে পারেনি। ১৬ জুলাই গ্রেফতারের পর মামলার পর মামলা দিয়ে জননেত্রীকে হয়রানি করা হয়। শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার জন্য সংস্কারপন্থিদের মাধ্যমে দলে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। নেত্রী জেলে যাওয়ার পর ভদ্র, বিনয়ী ও সর্বমহলে দুর্বল মানুষ হিসেবে পরিচিত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান সে সময় লৌহমানবে পরিণত হন। কারান্তরীন জননেত্রীর দৃঢ়তা ও সাহস, জিল্লুর রহমানের কুশলী নেতৃত্ব এবং দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বঙ্গবন্ধু পরিবার তথা দলনেত্রীর প্রতি প্রায় শতভাগ আস্থা ও সমর্থনের কারণে ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন গং পিছু হঠতে বাধ্য হয়। ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ হাসিনার মহাজোট বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবার ক্ষমতায় আসে।

১৭ জুলাই, ২০১৭।

[লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাবার্তা]

bandhu.ch77@yahoo.com

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close