logo

orangebd logo
লংগদু দাবানলের ইতিকথা ও বর্তমান
শ্যামল কুমার সরকার

৪ জুন ২০১৭ প্রাতঃভ্রমণ সেরে ঘরে এসেছি মাত্র। জাতীয় দৈনিক 'ভোরের কাগজের' প্রথম পাতাতে চোখ রাখতেই দেহ-মন নিথর হয়ে যায়। পত্রিকার শিরোনাম 'লংগদুতে আগুন হামলার ঘটনায় নিহত ১' দ্রুত পড়ে ফেলি। পত্রিকার শ্বাসরুদ্ধকর আর মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন সত্যিই আমার মর্মকে স্পর্শ করে। পত্রিকার প্রতিবেদনের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রাণ রক্ষার চেষ্টা আর পাহাড়ি শতাধিক ঘরবাড়ির ধ্বংসযজ্ঞের খবর দেখে আদিম যুগে ফিরে যাই। দেখতে পাই পাহাড়-লেক ঘেরা সুদৃশ্য লংগদু। লঞ্চে রাঙ্গামাটি যেতে-আসতে বহুবার লংগদুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। লংগদু বাজারে অনেক সময় কাটিয়েছি পাহাড়ি কলা-ফল খেতে খেতে। প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানি সাম্প্রতিক সহিংসতায় আগুনে পুড়ে নিহত পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার গুন মালা চাকমার (৭৫) কথা। একই পত্রিকার মাধ্যমে নুরুল ইসলাম খান নামের একজন মোটরবাইক চালকের মর্মান্তিক প্রাণহানির কথাও জানতে পারি। এতেও ভীষণ কষ্ট পাই। উলি্লখিত দুটি ঘটনা পার্বত্য জনপদে প্রথম নয়।

এটি সেখানকার বেদনাদায়ক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা মাত্র। ১৯৮৯ সালের লংগদু গণহত্যা, পরের মাল্যা গণহত্যা ও ১৯৯২ সালের লোগাং গণহত্যা তাই প্রমাণ করে। কেন বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে? দীর্ঘ দুই যুগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ১৯৯৭ সালে সবার প্রত্যাশিত 'শান্তি চুক্তি' হয়েছে। এতে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেস্কোর শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। বিশ্বনন্দিত সেই 'শান্তি চুক্তির' পরে আবার রক্ত ঝরা কেন? পাহাড়ি-বাঙালির এমন 'শান্তি চুক্তির' পরে আবার রক্ত ঝরা কেন? পাহাড়ি-বাঙালির এমন শত্রু শত্রু খেলা কি কখনোই বন্ধ হবে না? পার্বত্য জনপদে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতির ঐতিহাসিক পটভূমিঃ

জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) : পার্বত্য জনপদে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমারা সংখ্যায় অধিক এবং সব দিক থেকেই অন্যদের চেয়ে অগ্রগামী। এরই স্বাক্ষ্য পাওয়া যায় পাহাড়িদের অধিকার-সচেতন প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা নামে অধিক খ্যাত) প্রতিষ্ঠিত জনসংহতি সমিতি এর মাধ্যমে। এম এন লারমা তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে পাহাড়িদের অধিকারের কথা-বঞ্চনার কথা বলেন।

শান্তিবাহিনী গঠন : শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে পাহাড়িদের দাবি আদায় না হওয়াতে এবং ১৯৭৫-এর চরম বেদনাদায়ক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আশার কোন আলো না দেখে প্রয়াত এম এন লারমার নেতৃত্বে গঠিত হয় জেএসএসের সামরিক শাখা বা শান্তিবাহিনী। শান্তিবাহিনী দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ পাহাড়িদের অধিকার আদায়ে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে। এতে অসংখ্য সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। সম্পদের ক্ষতি হয়েছে অনেক।

ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি : শান্তি বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের পরে অবশেষে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও শান্তি বাহিনীর মধ্যে বহু কাঙ্ক্ষিত শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। তৎকালীন আওয়ামী সরকারের আন্তরিকতায় এটা সম্ভব হয়েছিল। অস্ত্র জমা দিয়ে শান্তি বাহিনীর সদস্যরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। সরকার তাদের অনেকের চাকরির ব্যবস্থাও করেন। রাঙ্গামাটি স্টেডিয়ামে শান্তিচুক্তীয় ২য় বর্ষপূর্তির আনন্দযজ্ঞের সে দৃশ্য এখনও দেখতে পাই। কোথায় গেল শান্তির সে পায়রাগুলো?

ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) : শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি পুরোপুরি একটি পাহাড়ি সংগঠন। এদের দাবি পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। জেএসএস বরাবরই ইউপিডিএফ কে শান্তিচুক্তি বিরোধী বলে আখ্যায়িত করে। আবার জেএসএসের বিরুদ্ধেও ইউপিডিএফের অভিযোগের কোন অন্ত নেই।

পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) : পাহাড়িদের বিশেষ করে পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের জন্য পিসিপি জন্ম লাভ করে। পার্বত্য জনপদে এই ছাত্র সংগঠনটি অতি পরিচিত।

হিল উইমেন ফেডারেশন : পাহাড়ি নারীদের অধিকার তথা পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে এই সংগঠনটি গড়ে উঠে। অত্র সংগঠনের অন্যতম নেত্রী কল্পনা চাকমার রহস্যজনক নিরুদ্দেশ পাহাড়ি জনগণ আজও কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করে। উল্লেখ্য, কল্পনা চাকমা রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাইল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বসতভিটা থেকে প্রায় দু'দশক আগে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। সে গ্রামের বাসিন্দাদের কাছ থেকে তাদের দুঃখের কথা শুনেছি। বহুল আলোচিত সে হত্যাকা-ের বিচার হয়নি। কল্পনা চাকমার পরিবারের সদস্যরা আজও বিচারের আশায় আছেন।

পার্বত্য জনপদের সমস্যার মূলে :

ভূমি বিরোধ : ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম আইনের মাধ্যমেই মূলত সেখানকার ভূমি ব্যবস্থাপনার কাজ সম্পাদিত হয়ে আসছে। স্থানীয়ভাবে হেডম্যান এবং কার্বারীরা জমি বন্দোবস্তের ব্যাপারে সহায়তা করে থাকেন। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী সংশ্লিষ্ট গোত্রের চিফ বা রাজা। প্রজারা বছরে একবার রাজাকে খাজনা প্রদান করে থাকে। রাজা কোন কোন প্রজার খাজনা মওকুফ করে থাকেন। উল্লেখ্য, পাহাড়িদের দখলকৃত জমির কোন দলিল দস্তাবেজ নেই। উত্তরাধিকার ও সামাজিক স্বীকৃতিই জমির মালিকানার একমাত্র রক্ষাকবচ।

সেটেলার উপাখ্যান : জিয়াউর রহমানের সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষদের তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করেন। এভাবেই শুরু হয় বাঙালিদের আস্তানা গাড়ার পালা। এ কাজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সহযোগিতা করে। বাঙালিদের রেশনসহ পাহাড়ি জমি বন্দোবস্ত করা হয়।

পাহাড়ি যুদ্ধ শুরু : পার্বত্য জনপদে বাঙালিদের পুনর্বাসনকে পাহাড়িরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। কারণ তাদের বিশ্বাস পাহাড় একান্তই তাদের। অন্যদিকে বাঙালিরা মনে করেন পাহাড়ে বাস করার সম্পূর্ণ এখতিয়ার তাদের রয়েছে। এমন বিরোধী চেতনা যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করে। উভয় পক্ষই যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম মজুদ করতে থাকে। সামন্য উছিলাতেই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা। রক্ত ঝরে। কিছু তাজা প্রাণ নিভে যায়। কিছুদিন মিডিয়া হৈ চৈ করে। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় না। একদিন ভুক্তভোগী ছাড়া সবাই সবকিছু ভুলে যায়।

পাহাড়ের শত্রু পাহাড় : পাহাড়িদের শত্রু মূলতঃ পাহাড়িরাই। তাই তো জুম্ম জাতির পিতা জেএসএসের প্রতিষ্ঠাতা মহান এমএন লারমাকে পাহাড়িদের হাতে অসময়ে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে (১০ নভেম্বর ১৯৮৩)। আবার শান্তিচুক্তির পর ইউপিডিএফের নবযাত্রা আমাদের অশনিসংকেত দেয়। পাহাড়িরা পাহাড়িদের অপহরণ করছে কেন? হত্যা করছে কেন? জেএসএস দ্বিখ-িত হলো কেন? এ দায় কার? পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ কি করছে? সেখানকার তিন সংসদ সদস্য?

ধর্মগ্রন্থ ব্যর্থ : পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মুসলমান। বাকিরা সংখ্যাগরিষ্ঠভাবে যথাক্রমে বৌদ্ধ, সনাতন ও খ্রিস্টধর্মের। পবিত্র কোরআন', 'ত্রিপিটক', 'গীতা', ও 'বাইবেল' কি তাহলে ব্যর্থ? সব ধর্মই তো অহিংস-নীতির কথা বলে। তাহলে 'আমার প্রতি তোমার অবহেল' কেন ? ধর্ম গ্রন্থের কথা শুধু শুনে লাভ কি? মানুষ মারার কথা কোন ধর্মগ্রন্থে আছে ?

গুচ্ছগ্রামের জীবন চিত্র : সেটেলার বাঙালি এবং পাহাড়ি উভয়ের জন্যই রয়েছে গুচ্ছগ্রাম। নামটা বাহারি হলেও সেখানকার জীবনযাপন মোটেও বাহারি নয়। রোগ-শোকে সেখানকার বাসিন্দাদের প্রায় সবাই কঙ্কালসার। দেখে চোখে জল আসে। যেন শুধু বেঁচে থাকার জন্যই এরা বেঁচে আছে। অধিকাংশ গুচ্ছগ্রামবাসী এখনো মধ্যযুগের বাসিন্দা। এদের বিভ্রান্ত করা কত সহজ!

চলমান বাস্তবতা : ইউএনডিপি দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ করে আসছে। ইউএনডিপি সেটেলার-বাঙালি পুনর্বাসনের প্রস্তাবও দিয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার ইউএনডিপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নিতে পারে।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উপায় :

(১) প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীকে নিজস্ব ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে (২) 'সবার উপর মানুষ সত্য' এ বাণী সবাইকে বুঝতে হবে (৩) আর কুশিক্ষা নয়। এখন থেকে সুশিক্ষিত হতে হবে (৪) কানে হাত না দিয়ে চিলের পেছনে দৌড়ানো বন্ধ করতে হবে (৫) নিরপেক্ষভাবে ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে (৬) মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে হবে (৭) পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করা যাবে না (৮) ব্যক্তির দায় কোনভাবেই গোষ্ঠীর ওপর চাপানো যাবে না (৯) অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে (১০) সন্ত্রাসীদের দলীয় প্রশ্রয় বন্ধ করতে হবে।

শুধু মুখের বুলি নয়। হৃদয় দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি সমস্যা সমাধানের রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। রাঙ্গামাটির লংগদু সংলগ্ন বাঘাইছড়ি উপজেলায় কর্মসূত্রে আমার অবস্থানকালে (১৯৯৮-২০০৩) দেখেছি সেখানে বাসরত পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যকার বিশ্বাস ও আস্থা যেন কচু পাতার পানি। হাল্কা বাতাসেও তা টলে পড়ে। কেউ কাউকেই বিশ্বাস করতে চায় না। সন্দেহের বীজ অনুকূল পরিবেশে অতি সহজেই অঙ্কুরিত হয়ে রাতারাতি বিশাল বিষবৃক্ষে পরিণত হয়ে সুদৃশ্য ফলে ভরে যায়। সে ফল হতে আবার চারা গজাতে থাকে। যে কোন মূল্যে অশান্তির দাবানলকে শান্তির শীতল পানি নিয়ে নিভাতে হবে। এ যে মানবিক বিপর্যয়! আমাদের জাতীয় লজ্জা। পার্বত্য অঞ্চলসহ সারাদেশের নৃ-তাত্তি্বক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ দায় কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কোনভাবেই এড়াতে পারে না।

[লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ঝিটকা খাজা রহমত আলী ডিগ্রি কলেজ, মানিকগঞ্জ]

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close