logo

orangebd logo
চুকনগরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি নৃশংসতম গণহত্যা
মোঃ মুজিবুর রহমান

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী কর্র্তৃক পরিচালিত প্রতিটি গণহত্যার লক্ষ্য ছিল আমাদের স্বাধীনতার অমূল্য সম্পদকে ধ্বংস করা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করা। বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে এবং এ গণহত্যা দেশের সর্বত্র চলেছে মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়টি মাস। ২৬ মার্চ ১৯৭১ যখন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তখনো ঢাকাসহ কয়েকটি জেলাতে গণহত্যা চলছিল। অন্যদিকে শুরু হয় বাঙালির প্রতিরোধ। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত। বর্তমানে গণহত্যা আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। এই মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে এতো ব্যাপক ও নৃশংসতম গণহত্যা আর ঘটেনি। যা ঘটেছিল একাত্তরে আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশে। এ গণহত্যা বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বারা পরিচালিত ছিল। গণহত্যা ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নীল নকশা অনুযায়ী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নৃশংসতম গণহত্যা কোনো একটি দেশের জন্য নয়, এটা ছিল বিশ্ব মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয় মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি (পিস) কমিটির লোকেরা গণহত্যা চালায়। বাংলার মাটিতে এ অপরাধের বিচারকার্য চলছে এবং ইতোমধ্যে বিচারের অনেকটি রায়ও কার্যকর হয়েছে।

আজ ২০ মে ২০১৭, শনিবার। চুকনগর গণহত্যা দিবস। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই দিনে খুলনা জেলার পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত চুকনগরে ঘটে যায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি নৃশংসতম গণহত্যা। সে প্রেক্ষিত মুক্তিযুদ্ধের বেদনাদায়ক গণহত্যার স্মৃতিবিজড়িত স্থান হয়ে রয়েছে চুকনগর। চুকনগর খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার অন্তর্গত। এই উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নে চুকনগর অবস্থিত। খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার অন্তর্গত চুকনগর একটি ছোট্ট ব্যবসাকেন্দ্রিক এলাকা তথা বাজার। এলাকাটি সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যস্ততা লেগেই থাকত। এছাড়া এলাকাটি ছিল কর্মমুখর। চুকনগর খুলনা শহর থেকে ৩২ কিমি পশ্চিমে ভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত। ১৯৭১ সালের এ দিনটিতে চুকনগরে স্থানীয় রাজাকার ও শান্তি কমিটির সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আক্রমণ চালায়। তারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু হত্যা করে। বাড়িতে অগি্নসংযোগ এবং লুটতরাজ চালানো হয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনী যে হত্যাকা- অভিযান সূচনা করেছিল তার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করা। আমাদের স্বাধীনতা আমাদের প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য সম্পদ। বাঙালি জাতিসত্তাকে ধ্বংস করার জন্য গণহত্যা শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে আর এ গণহত্যা দেশের সর্বত্র চলেছে মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়টি মাস। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তখনো ঢাকাসহ কয়েকটি জেলাতে গণহত্যা চলছিল। পাকিস্তানি বাহিনী সারাদেশে গণহত্যা শুরু করলে তার প্রভাব এসে পড়ে খুলনাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায়। সারাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি (পিস) কমিটির লোকেরা মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধ করেছে। দেশের গণহত্যার জঘন্য নজির স্থাপিত হয় একাত্তরের মে মাসের ২০ তারিখে চুকনগরে। কেউ কিছু অনুধাবন করার আগেই গর্জে ওঠে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অস্ত্র। গুলি আর গুলি। তা যেন বৃষ্টির মতো। পাখির মতো মরতে থাকে মানুষ। দুই থেকে তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয় পাকিস্তানি বাহিনীর তা-বলীলা। পাশে ভদ্রা নদী। লাশে ভরপুর। শহীদদের তাজা রক্তে লাল হয়ে যায় এ নদীর পানি।

ভারতে পাড়ি দেয়ার জন্য খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরিশাল, গোপালগঞ্জ থেকে হাজার হাজার বাঙালি নৌপথে ও পায়ে হেঁটে আসতে থাকে চুকনগরে। এ আসা নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ইতোমধ্যে অনেক বাঙালি সীমান্তের ওপার ভারতে চলে গেছেন। ২০ মে ১৯৭১। চুকনগরে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত বাঙালিরা অপেক্ষা করতে থাকে। প্রতিদিনের মতো আগের দিন চুকনগরে আগত বাঙলিরা আশ্রয় গ্রহণ করে ওই এলাকার স্কুল ঘরে, বাজারে, পাশে পাতোখোলা বিলের ধারসহ বিভিন্ন স্থানে। এই পলায়ন শুধমাত্র জীবন বাঁচানোর জন্যই নয়। অনেকের লক্ষ্য ভারতে গিয়ে স্বদেশ ভূমিকে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী থেকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ্রগহণের জন্য নাম লেখানো। ২০ মে সকাল বেলায় প্রত্যেকেই ভারতের উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে সকাল ১০টার দিকে সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর দুই/তিনটি গাড়ি এসে থামে পোতোখোলা বিলের পাশে। স্থানীয় রাজাকার, আলবদর ও অবাঙালির (বিহারী) সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী শুরু করে হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি বাহিনী সৈন্যের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। সম্ভাবত এক প্লাটুন। ট্রাক থেকে নেমে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী এলোপাতারি গুলি করতে থাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি কর্মমুখর ও ব্যস্ত এলাকা পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। শুধু মৃত শরীরের স্তূপ। মৃত শিশু মৃত মায়ের কোলে, বাবার কোলে। স্ত্রী তার স্বামীর কোলে _ এ রকম চিত্র সেদিনের হত্যাযজ্ঞে, দেখতে পাওয়া যায়। এই গণহত্যার পাশাপাশি বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী যুবতী নারীদের ধর্ষণ করে। এছাড়াও অনেক বাঙালিকে নিকতবর্তী পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে পরে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। আবার যারা আহত হয়েছিল তাদের বর্বর পাকিস্তানি বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। ভদ্রা নদীতে লাশ ফেলার দায়িত্ব দেয়া হয় অনেককে। প্রতি লাশের জন্য ৫০ পয়সা প্রদান করা হবে_ এ ধরনের ঘোষণা দেয়া হয়। লাশের গায়ে যেসব সোনা-গয়না ও লাশের সাথে নগদ অর্থ যা পেয়েছে তার কারণে গুনে গুনে লাশ ফেলানোর গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে লাশ ফেলানোর নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ। এই ব্যক্তিবর্গের মধ্যে এখানো জীবিত রয়েছে কেউ কেউ। তাদের মতে যতগুলো লাশ প্রথমদিকে গুনে রেখেছিল তার চেয়ে বেশি লাশ ভদ্রা নদীতে ফেলা হয়। বর্বর হানাদার বাহিনী চুকনগর থেকে চলে যাওয়ার পর সেখানে ছিল চিল-শকুনের দল। চুকনগরে গণহত্যায় কত বাঙালি শহীদ হয়েছিল তার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা না গেলেও চুকনগরে ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

১৯৭১ সালে গণহত্যার শিকার হয়েছিল নিষ্পাপ শিশু, অসহায় নারী, বৃদ্ধ, যুবক-যুবতীসহ সকল স্তরের মানুষ। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই গণহত্যা হয়েছিল। মনে রাখা দরকার, একেবারে সামরিক শক্তিতে পুষ্ট হয়েও মুক্তিপাগল বাঙালির বিজয় অভিযানকে রুদ্ধ করতে পারেনি বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর লজ্জাজনক আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছিল এই বর্বর বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সারাদেশে যে নৃশংসতা ও লোমহর্ষর্ক ঘটনা ঘটেছিল তা অনুধাবন করা আমাদের পক্ষে কঠিন। এ অবস্থায় সেই নৃশংসতার সাক্ষী হয়ে রয়েছে চুকনগরের গণহত্যা। সেদিনের শহীদদের উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে যা চুকনগর শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নামে পরিচিত। পাকিস্তানি বাহিনী একাত্তরে যে নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছে, বাঙালিদের যেভাবে হত্যা, পীড়ন ও দেশান্তরী করেছে_ এ সকল বিবরণের স্বার্থে চুকনগরে গড়ে তোলা দরকার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কমপ্লেঙ্ বা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক জাদুঘর। বর্তমান ও ভবিয্যৎ প্রজন্মকে গণহত্যার বিষয়ে সচেতন করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে। সেই সঙ্গে এ গণহত্যা বিষয়ে তাদেরকে বিস্তারিত জানাতে হবে। মনে রাখা উচিত সেদিনের গণহত্যার শিকার মানুষদের প্রতি আমাদের রয়েছে দায়বদ্ধতা। এই দায়মোচনের সার্বিক বিচার বিশ্লেষণ এখন জরুরি। গত ১১ মার্চ ২০১৭ জাতীয় সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস ঘোষিত হয়। এটা এক ঐতিহাসিক ক্ষণ হিসেবে গণ্য হওয়ার দাবি রাখে। এবারই প্রথম সারাদেশে ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস পালিত হয়। পাশাপাশি চুকনগর গণহত্যা দিবসকে শুধুমাত্র স্মরণসভার মধ্যে সীমিত না রেখে বর্তমান ও ভবিয্যত প্রজন্মকে বর্বরতম গণহত্যার বিষয়ে সচেতন করে তোলা খুবই দরকার। এ জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে আমাদের সকলকে। সেইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে_ তা হতে হবে সারাদেশের। আর জানান দিতে হবে স্বাধীনতা নামে শব্দটি অর্জনে বাঙালি জাতির বিপুল আত্মত্যাগ ও দুঃখভোগ মিশে আছে।

[লেখক : কলেজ শিক্ষক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক এবং আর্কাইভস ৭১-এর প্রতিষ্ঠাতা]

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close