logo

orangebd logo
দেশের কথা দশের কথা
দেশ দরদি ও দেশ বিরোধী প্রসঙ্গে
মো. মইনুল ইসলাম

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত সফর ও বিরোধীদল বিএনপির প্রতিক্রিয়া বিষয়ে কিছু আলোচনই বর্তমান নিবন্ধের উদ্দেশ্য, ভারত আমাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশ। দেশটি বৃহৎ এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের বিরাট অবদান আমরা অস্বীকার করতে পারি না। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হাসিনার ভারত সফর এ সম্পর্ক নবায়ন ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ তিনটিসহ ২২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (গড়ঁ) সই করেছেন। এর প্রত্যেকটির বিবরণ আমাদের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা, আইন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভারতে প্রশিক্ষণ, দুই দেশের সুবিধার্থে নৌ চলাচলও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার প্রভৃতি বিষয়ে দুই দেশের সমঝোতা ও চুক্তি উল্লেখযোগ্য। দেশে ৩৬টি কম্যুনিটি ক্লিনিক স্থাপনে ভারতের অর্থায়নও উল্লেখ করার মতো।

এ সফরের দুটো বিষয় নিয়ে বিরোধীদল বিএনপি বেজায় সোচ্চার। সার্বিকভাবে তাদের মূল্যায়ন হলো এ সফর ব্যর্থ। প্রধানমন্ত্রী শূণ্য হাতে ফিরে এসেছেন। তাদের সমালোচনার প্রধান দুটো বিষয়ের একটি হল বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ক্ষাতে ভারতের ৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণদান। বাংলাদেশ পছন্দ এবং প্রয়োজন মতো এ ঋণের টাকায় ভারত থেকে অস্ত্র কিনতে পারবে। এখানে চাপিয়ে দেয়ার কোন ব্যাপার নেই। তাই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার কোন কারণ আছে বলে মনে হয় না। দ্বিতীয়টি হলো তিস্তার পানির অভাবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল দারুণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে তিস্তার পানির ব্যাপারটির সুরহা হবে বলে দেশবাসীর আশা ছিল। সেটা হয়নি বলে মানুষ কিছুটা হতাশ হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তি মুখ্যত দায়ী। তবে মমতা একটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন, যা অবশ্য গ্রহণযোগ্য নয়। তিস্তার পানিই আমাদের দরকার। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-আশ্বাস দিয়েছেন তার এবং শেখ হাসিনার মেয়াদ কালেই তিস্তার পানির ব্যাপারটি একটি সুরাহা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে মাধ্যমে আর যাই হোক দুই দেশের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কে যে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রটোকেল ভেঙে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কে বরন করার জন্য বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর আলাপ-আলোচনার বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। শেখ হাসিবা আমাগেদর সব দাবি দাওয়া একপটে তুলে ধরেছেন, যা খালেদা জিয়া সাহস বা জ্ঞানের অভাবে তার সফরে করতে ব্যর্থ হন। সব কিছু পান নাই বটে, তবে মমতা আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে রাজি হয়েছেন। ত্রিপুরা থেকে আরও ৬০ মেগাওয়াট পাওয়া যাবে আশ্বাস পাওয়া গেছে, আসাম থেকে বাংলাদেশ ওপর দিয়ে ভারতের বিহারে বিদ্যুৎ নেয়ার সমঝোতা হয়েছে। এখান থেকে বাংলাদেশ ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিতে পারবো তেমনি ভাবে ভারতে ওপর দিয়ে ভুটান থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ আনতে পারবে। কঙ্বাজারে তরলিকৃত প্রকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল স্থাপনে ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য করবে। কুতুবদিয়ায় একটি এলপি গ্যাস কেন্দ্র স্থাপন করবে ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন। খুলনা-যশোর অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহে ভারতের সাহায্য পাওয়া যাবে। তাই বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র বেড়েছে।

তাছাড়া এ সফর কালে শেখ হাসিনা শুধু দেশের প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা পালন করেননি, একজন স্নেহময়ী অতিথি পরায়ণ বাঙালি নারীর ভূমিকাও পালন করেছেন। ভারতের বাঙালি রাষ্ট্রপতিকে নিজহাতে রান্না করে ভাপা ইলিশ খাইয়ে এসেছেন। একদিকে রাষ্ট্র নায়ক সুলভ আচরণ অন্য দিকে শাশ্বত বাঙালি নারীর আদর-আপ্যায়ন মিলে তার দিল্লী সফর আমাদের মত প্রবীণ মানুষসহ সবাইকে মুগ্ধ করেছে। ভালোমন্দ মিলিয়েই মনুষ। মেখ হাসিনাও তেমনি একজন। তবে তার দেশ পরিচালনায় তার আন্তরিকতার প্রশংসা না করে পারা যায় না। জাতীয় স্বার্থ এবং সুবিধা বন্ধুত্বের মাধ্যমেই অর্জন করা যায়, ঝগড়ার মাধ্যমে নয়। প্রতিবেশী দেশের প্রতি তার এই নীতি গভীর প্রজ্ঞার পরিচায়ক। তবে হেফাজতের মত মৌলবাদি শক্তি সঙ্গে আপস রক্ষা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সঙ্গতি পূর্ণ নয়। দ্বিতীয় দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে দম্ভব বা বপেরোয়া মনোভাব যেন জাগ্রত না হয় সে ব্যাপারে তাকে সজাগ থাকতে হবে। সজাগ থাকতে হবে তাটার দল এবং দলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুবিধাবাদী, সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের ব্যাপারেও।

আগেই বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার এই সফর নিয়ে ইতিমধ্যে বিএনপি-সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে, খালেদা জিয়ার মতে, 'আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়াম লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছে, পাঁচ বছর পর দেশটা কাগজে-কলমে বারতের কাছে বিক্রি করে দিয়ে আওয়ামী লীগ বিদায় নিবে। দেশ বিক্রির কথা আগেও তিনি বলেছেন। পার্বত্য শান্তি চুক্তির ব্যাপারেও বলেছেন, ফেনী থেকে বেলেনিয়া পর্যন্ত ভারতে চলে যাবে। এখন সুর নরম করে বলছেন, শেখ হাসিনার ভারত সফর ব্যর্থ। শূন্য হাতে ফিরে এসেছেন। অমালীন, অযৌক্তিক এবং আক্রমণাত্মক বক্তব্য ছাড়া বিএনপি নেত্রীর কাছ থেকে শালীন ও যৌক্তিক কথা শুনেছি বলে মনে পড়ে না। তার সঙ্গে বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদও এ ব্যাপারে যোগ দিয়েছেন। তার মতে ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি জাতীয় স্বার্থ বিরোধী এই চুক্তি দেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। এ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ও রুহুল কবির রিজভীর উগ্র-আক্রমণাত্মক ঘন ঘন বক্তব্য-বিবৃতির কথা না বলাই ভালো।

শেখ হাসিনা দেশ বিক্রি করে দিবে এটা এদেশের কোন মানুষ বিশ্বাস করবে না। আর একটা দেশ বিক্রি হয় না। এটা এক অর্থে পাগলের প্রলাপ মাত্র। তবে বিএনপির নেতা-নেত্রীদের দেশ লুটপাটের অসংখ্য ঘটনা দেশবাসী জানে। গ্যাটকো, নাইকো, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও অরফ্যানেজ ট্রাস্ট মামলা হল দুর্নীতির বিশেষ কয়েকটি অভিযোগ মাত্র। তাদের আমলের অসংখ্য ঘটনা দেশবাসী জানে। আজকাল খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনে যেসব মুখ দেখি তাদের অনেকেরই অতীত ইতিহাস আমাদের জানা। শুধু একটি মাত্র উদাহরণ এখানে উল্লেখ করলে তাদের সত্য, সততা এবং দেশ প্রেমের আসল চিত্রটি ফুটে উঠবে। গেল ৭ তারিখে (৭-৪-১৭) দ্য ডেইলি স্টারে ঘওকঙ ংরমহবফ নৎরনবৎু ফবধষং শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠায় কানাডার নাইকো কোম্পানি বাংলাদেশে যে ঘুষ কেলেঙ্কারির অবতারণা করে তার বিস্তারিত বিবরণ আছে। তখনকার বিএনপি সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তিদের ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে টেন্ডার ছাড়া অনভিজ্ঞ এবং, অনুপযুক্ত এই কম্পানিটি টেংরাটিলায় গ্যাস উত্তোলনের কাজটি পায়। গ্যাস তুলতে গয়ে কারিগরি অদক্ষতার কারণে তারা ব্যাপক বিস্ফোরণ ও অগি্নকা- ঘটায়। ফলে দেশের ১০০ কোটি ডলারের ও বেশি গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়। পরিবেশের যে ক্ষতি হয় তা টাকার অঙ্কে প্রকাশ করা যায় না। এই ঘুষ কেলেঙ্কারিতে দেখা যায় বিএনপি সরকারে তিন মন্ত্রী জড়িত ছিল। তারা হলেন এ কে এম মোশাররফ হুসেন (প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি), মওদুদ আহমদ (আইনমন্ত্রী) এবং খালেদা জিয়া (প্রধানমন্ত্রী)। আর জড়িত তিন ব্যবসায়ী হলেন, কালেম শরীফ সেলিম ভূঁইয়াও তারেকের বন্ধু এবং ব্যবসায়িক অংশীদার গিয়াস উদ্দিন আল মামুন। খালেদা পুত্র তারেক এবং তারেকের বন্ধু মামুন বিএনপির দ্বিতীয় মেয়াদে হাওয়া ভবনকে কেন্দ্র করে দেশভ্যাপী যে দুর্নীতির মহা রাজত্ব কায়েম করেছিল তা দেশবাসীর অজানা নয়। এ কেলেঙ্কোরিতে তারেকের ভূমিকার ব্যাপারে রয়েল ক্যানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশকে মামুন যে বক্তব্য দেয় সেটার ভিডিও দেখার জন্য ডেইলি স্টার নির্ভুল সূত্রটিও দিয়েছে।

আজ যখন এদের (বিএনপির) মুখে দেশ বিক্রি এবং জাতীয় স্বার্থ বিসর্জনের কথা শুনি, এখন মনে হয় ভূতের মুখে রাম নাম শুনছি। হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নতি আজ দেশে-বিদেশে স্বীকৃত এবং নন্দিত তাই দেশ দরদী এবং দেশ বিরোধী কারা তা দেশবাসী ভালো করেই জানে।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close