logo

ঢাকা, শুক্রবার ৫ ফাল্গুন, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

orangebd logo
শিশুর বিকাশে ভিটামিন 'এ' প্লাস ক্যাম্পেইন
মো. আবদুল আলীম

শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ভিটামিন 'এ' প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে। ১০ ডিসেম্বর শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সারাদেশে ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের নীল এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের একটি করে লাল রঙের ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। 'ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল খাওয়ান, শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমান' এ সেস্নাগানকে সামনে রেখে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় পালিত হয়েছে জাতীয় ভিটামিন 'এ' প্লাস ক্যাম্পেইন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম রাজধানীর শিশু হাসপাতালে দেশব্যাপী ভিটামিন 'এ' প্লাস ক্যাম্পেইন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।

এ বছর দেশের ২ কোটি ১০ লাখ শিশুকে ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুর সংখ্যা ২৩ লাখ এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুর সংখ্যা ১ কোটি ৮৭ লাখ। স্বাস্থ্যকর্মীসহ দেশের সর্বস্তরের জনগণের সহায়তায় দেশের ১ লাখ ২০ হাজার স্থায়ী টিকাদান কেন্দ্র এবং ২০ হাজার অস্থায়ী বা ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে এ কর্মসূচি সফল করা হয়। এছাড়া, এবার দুর্গম এলাকায় ভিটামিন 'এ' প্লাস ক্যাম্পেইন সফর করার জন্য পরবর্তী চার দিন বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

মাতৃদুগ্ধে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন 'এ' থাকে। তাই সন্তান ভূমিষ্ট হবার পর থেকেই নবজাতককে মায়ের বুকের শালদুধ পান করাতে হবে। শিশু জন্মের পর থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ পান করালে শিশুর রাতকানা হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোনো দেশ রাতকানা রোগের শতকরা হার ০.১ ভাগের বেশি হলে সে দেশকে একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যার দেশ বলে বিবেচনা করে।

বাংলাদেশ ডেমেগ্রাফিক হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) এর রিপোর্ট ২০১৫ এর জরিপে মতে, দেশে বর্তমানে ভিটামিন 'এ' এর অভাবজনিত কারণে রাতকানা রোগের হার এক শতাংশের নীছে রয়েছে। ১৯৯৪ সাল থেকে বাংলাদেশে ভিটামিন 'এ' সপ্তাহ পালন শুরু হয়। ২০১১ সালের আগ পর্যন্ত ১-৫ বছর বয়সী সব শিশুকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন- 'এ' ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো। ২০১২ সাল থেকে ১ থেকে ৫ বছরের সব শিশুর পাশাপাশি ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর দু'বার ভিটামিন 'এ' প্লাস ক্যাম্পেইন পালন করা হয়।

ভিটামিন 'এ' এর অভাবজনিত সমস্যা বাংলাদেশে এখনও একটি অন্যতম প্রধান পুষ্টি সমস্যা। ভিটামিন- 'এ' এর অভাবে বাাংলাদেশে প্রতি বছর অনেক শিশু রাতকানা রোগে ভোগে এবং অন্ধত্ববরণ করে। এছাড়াও মানব দেহের বিভিন্ন কার্য সম্পাদনের জন্য ভিটামিন 'এ' একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। ভ্রুণের বিকাশ, দৃষ্টিশক্তি, শরীরের কোষ ও কলার রক্ষণাবেক্ষণে ভিটামিন 'এ' প্রয়োজন। ভিটামিন 'এ' চোখের দৃষ্টিশক্তি সঠিক রাখে, রোগসংক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করে এবং রোগ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। রাতকানা রোগ হলো ভিটামিন 'এ' এর অভাবজনিত প্রধান লক্ষণ। ভিটামিন 'এ' এর অভাবে শিশুরা রাতের বেলা স্বল্প আলোতে ঠিকমত দেখতে পায় না। রাতকানা রোগের কারণে শিশু এক সময় অন্ধও হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও ভিটামিন 'এ' এর অভাবে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ বেড়ে যায় এবং রক্তস্বল্পতা ও শারীরিক বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটে।

উদ্ভিজ্জ উপাদানই ভিটামিন 'এ' এর প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত। সবুজ ও হলুদ রঙের শাক-সবজিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন 'এ' সমৃদ্ধ ক্যারোটিন থাকে। মায়ের দুধে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন 'এ' থাকে। প্রাণিজ উৎসের মধ্যে-কলিজা, ডিম, মাছ, মাংস, মলা-ঢেলা, কাঁটাযুক্ত মাছ ও মাছের তেলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন 'এ' থাকে। এছাড়া দুগ্ধজাতীয় খাদ্য যথা-মাখন, ঘি, ছানা, দই ইত্যাদিতে ভিটামিন 'এ' পাওয়া যায়। তবে প্রাণিজ উৎসের এ সব খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় অনেকের পক্ষে এ সব খাবার প্রচুর পরিমাণে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তাই উদ্ভিজ্জ উপাদানকেই আমাদের প্রাধান্য দেয়া উচিত। এগুলো দামেও সস্তা এবং সহজেই পাওয়া যায়।

ভিটামিন- 'এ' এর ঘাটতি রোধে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের শুধুমাত্র মায়ের দুধ পান করাতে হবে। আর দু'বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য ভিটামিন 'এ' সমৃদ্ধ খাবার দিতে হবে। বাংলাদেশে সব ঋতুতেই ভিটামিন 'এ' সমৃদ্ধ কোনো না কোনো ফল, শাকসবজি পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে মিষ্টি কুমড়া, পুঁইশাক, কলমিশাক, পেয়ারা, ডাঁটাশাক মৌসুম ভেদে পাকা আম, জাম, কাঁঠান, কলা, পেঁপে, আনারস এবং গাঢ় রঙের শাকসবজি ও হলুদ ফল-মূল ইত্যাদি। এছাড়া মাছ, ডিম, কলিজা, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ এবং দুগ্ধজাতীয খাবার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখতে পারলে ভিটামিন 'এ' এর ঘাটতি মেটানো যায়। গর্ভাবস্থায় মায়েদের খাবার তালিকায় কিছুটা বেশি মাত্রায় ভিটামিন 'এ' সমৃদ্ধ খাবার যুক্ত করতে হবে। এছাড়া শিশুদের ভিটামিন- 'এ' এর চাহিদা পূরণের জন্য ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী সব শিশুকে বছরে দুইবার ভিটামিন 'এ' প্লাস ক্যাম্পেইনের সময় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে।

বর্তমানে খুব ছোট ছোট শিশুদের চোখের সমস্যা দেখা যায়। এ সমস্যা গ্রামের শিশুদের চেয়ে শহরের শিশুদের বেশি। চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মতে, এর প্রধান কারণ শহরের শিশুদের খাদ্যাভাস। শহরের বেশিরভাগ শিশুরা ছোট কাঁটাযুক্ত মাছ খেতে অভ্যস্ত নয়। কাঁটা বেছে শিশুর ছোট মাছ খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে তোলার সময় অনেক মা-বাবার থাকে না। আবার অনেক পরিবারের শিশুদের শাকসবজি জাতীয় খাবারেও অনীহা রয়েছে। তারা ছোট বেলা থেকেই ফাস্টফুড খেতে অভ্যস্ত। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, সবুজ শাকসবজি, ফলমূল ও ছোট মাছ ভিটামিন 'এ' এর প্রধান উৎস। আর ভিটামিন 'এ' এর অভাবে শিশুর দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যায় এবং অনেকে স্থায়ী অন্ধত্ববরণ করে।

এ বছর ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল খাওয়ানোর সময় ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ এবং ছয় মাস বয়সের পর থেকে দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি পরিপুরক খাবার খাওয়ানোর বিষয়ে মায়েদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। অসচেতনতা ও খাদ্যাভাসের কারণে শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরকার দেশের পুষ্টি সমস্যাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে দেশের সর্বত্র জাতীয় পুষ্টিসেবা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। শিশুদের ভিটামিন 'এ' এর অভাবজনিত অন্ধত্ব রোধে জাতীয় ভিটামিন 'এ' প্লাস ক্যাম্পেইন সফলভাবে বাস্তবায়ন হওয়ায় দেশে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও অন্ধত্বের হার ব্যাপকভাবে কমে এসেছে।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে

যোগাযোগ কার্যক্রম নিবন্ধ)

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.