logo

ঢাকা, শুক্রবার ৫ ফাল্গুন, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

orangebd logo
বেলা অবেলার কথা
গমের বস্নাস্ট রোগবিষয়ক কিছু আলোচনা
ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

গম এক সময় গরিবের খাবার ছিল। চালের চেয়ে দাম ছিল অর্ধেক। রুটি খেয়ে দিন গুজরান; খুব একটা ভালো নজরে দেখা হয়েছে বলে মনে পড়ে না। ১৯৭৪ এর আকালের পর এ ধারণা বদলাতে থাকে। গমেরও বরাত বলতে হয়; স্বাস্থ্য সচেতনদের এক নম্বর পছন্দের তালিকায় উঠে আসে ফসলটি। পাশাপাশি গমের আবাদ-বৃদ্ধির চেষ্টা চলতে থাকে। ১৯৭১/৭২ এ আমাদের দেশে গমের আবাদ হয়েছিল ০.১৩ মিলিয়ন হেক্টর। ১৯৯৮/৯৯ এ আবাদি আওতা বেড়ে দাঁড়ায় ০.৮৮ মিলিয়ন হেক্টরে। সাতাশ বছরে ৭ গুণ। আর মোট উৎপাদনের বেলায় ১৭ গুণ। ফলনের কথা যদি বলি। শুরুতে ফলন বেশ কম ছিল। হেক্টরে একটন থেকেও কম (০.৮৭ টন/হে)। আটানব্বই/নিরানব্বই সালে ফলন দাঁড়ায় হেক্টর প্রতি ২.১৫ টনে। অর্থাৎ গম নিয়ে আমাদের এই যাত্রাটা ভালোই ছিল। কিন্তু নিরানব্বইয়ের ধাক্কা বলে সত্যি কিছু আছে কিনা কে জানে। এরপর থেকে গমের আবাদ কমতে থাকে। এবং কমতে কমতে ২০১১-১২ সালে ০.৩৬ মিলিয়ন হেক্টরে নেমে আসে। এজন্য বিশিষ্ট গমবিজ্ঞানী ড. নরেশ দেববর্মা দুটো কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। এক: মেগা-ভ্যারাইটি 'কাঞ্চন' এর লিফ-বস্নাইট এবং লিফ রাস্ট রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যাওয়া। দুই: গম প্রধান এলাকায় ভুট্টা ও আলুর অনুপ্রবেশ। মোট কার্বোহাইড্রেটের কথা যদি ভাবা যায় তাহলে হয়তো উৎপাদন কমেনি। কিন্তু আমাদের দেশে ভূট্টার চাহিদা পশুখাদ্য হিসাবে। আলুর উৎপাদন বেশি হয়ে গেলে সংরক্ষণের সমস্যা হয়। দাম পড়ে যায়। পক্ষান্তরে ধানের পরেই দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য হিসাবে গমের গুরুত্ব এখন যথেষ্ট। তাই গমের ভগ্নদশা থেকে টেনে তোলার জন্য বিজ্ঞানীদের চেষ্টার শেষ ছিল না। তারা 'কাঞ্চনের' বিকল্প হিসাবে ২০০০ সালে 'শতাব্দী' অবমুক্ত করে। ২০০৫ সালের পর অবমুক্ত করেকিছুটা তাপসহিষ্ণু বারিগম ২২ (সুফি), বারিগম ২৩ (বিজয়) এবং বারিগম২৪ (প্রদীপ)। সাম্প্রতিক সময়ে প্রদীপ সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত। মোট গম উৎপাদনের ৩৫ শতাংশ এলাকা জাতটির আওতায়। ২০১০ এর পরে উদ্ভাবিত সবগুলো জাতই কোনো না কোনো বৈরী পরিবেশে সহনশীল। যেমন বারিগম ২৫ একই সঙ্গে তাপ এবং লবণ সহিষ্ণু জাত। বারিগম ২৬ ও তাপসহনশীল। বারিগম ২৭ এবং ২৮ স্টেমরাস্ট রোগ প্রতিরোধী। ২০১৪ থেকে ১৭ অবধি অবমুক্তকৃত জাতগুলো (বারিগম ২৮, বারিগম ২৯, বারি গম ৩০, বারি গম ৩১ ও বারি গম ৩২) স্বল্পজীবনকাল সমৃদ্ধ এবং তাপ সহিষ্ণু। জাতগুলোর ফলনও বেশ ভালো ছিল। মাঠ পর্যায়ে হেক্টর প্রতি ৩.০ টনের কম নয়। অতএব গম নিয়ে যখন আমাদের নতুন করে চলার শুরু তখনই আবার আরেক ফ্যাসাদ সামনে এসে দাঁড়ায়_ গমের বস্নাস্ট রোগ। রোগটি ১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে প্রথম ধরা পড়ে। ২০০৯ সালে সে দেশের তিন ভাগের এক ভাগ ফসল নষ্ট হয়ে যায় এ রোগের কারণে।

এ রোগের বিরূদ্ধে প্রতিরোধী ভালো কোনো জাত বিজ্ঞানীদের হাতে এখনও উদ্ভাবন করা যায়নি। এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোনো দমন ব্যবস্থাও নেই। আর এই রোগের পছন্দের পরিবেশ আমাদের যেমন আবহাওয়া_ আর্দ্র এবং উষ্ণ। এসব বিচারে রোগটি শুধু বাংলাদেশ নয়; উপমহাদেশের সব আর্দ্র এবং উষ্ণ পরিবেশের জন্য ভয়ানক হতে পারে। এ কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির উদ্ভিদ রোগতত্ত্বের অধ্যাপক বারবারা ভ্যালেন্টের সতর্কবাণী হলো, "It’s really critical that it be controlled in Bangladesh.

গমের বস্নাস্ট আমাদের দেশে প্রথম নজরে আসে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, কুষ্টিয়ায়। তারপর মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ এবং যশোরে। এ এলাকা থেকে বেশ দূরে বরিশাল এবং ভোলাতেও রোগটি দেখা যায়। কোথায় ব্রাজিল আর কোথায় বাংলাদেশ! এদুটো দেশের বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও কোথাও কিছু আক্রমণের কথা শোনা গেছে। এ ছাড়া আর কোথাও তেমন ভাবে এ আক্রমণের খবর পাওয়া যায় না। এখন কথা উঠতে পারে এত দূর থেকে আমদের দেশে কিভাবে এ রোগ আসলো? বিজ্ঞানীদের ধারণা_ ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গমের সঙ্গে এ রোগের জীবাণু আসতে পারে। আরেক সম্ভাবনা হলো দেশের মধ্যেই ঘাস জাতীয় কোন উদ্ভিদকে বিকল্প পোষক হিসাবে ব্যবহার করে এতদিন কায়-ক্লেশে জীবননির্বাহ করছিল। এখন সুযোগ বুঝে গমের জমিতে আক্রমণ করে বসেছে। গমের বস্নাস্ট বীজ এবং বাতাসবাহী। তাই দুটোই হতে পারে। এ ধরনের আনুবীক্ষণিক জীব অভিযোজনের তাগিদে তাদের ধারা-উপধারা তাড়াতাড়ি বদলে নিতে পারে।

সচারাচর শুরুতেই ফসলের কোনো রোগ ততটা মারাত্মক হয়ে দেখা দেয় না। সময়ের সঙ্গে প্রকোপতা বাড়তে থাকে। তবে গমের বস্নাস্ট নিশ্চয়ই ব্যতিক্রমধর্মী। গত বছর ১৫,০০০ হেক্টরজমির গম আক্রান্ত হয়। বাকি ফসল বাঁচাতে বা পরের বছর যাতে নতুন করে রোগটি না দেখা দেয় সেজন্য অনেক জমির গম পুড়িয়ে ফেলা হয়। সরকার, গবেষক, সম্প্রসারণবিদ থেকে শুরু করে কৃষক এবং মিডিয়া সবাই বেশ কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার (ভলিয়্যুম ৫৩২ ইস্যু ৭৬০০) ২৭ এপ্রিল ২০১৬ সংখ্যায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তার শিরোনাম ছিল_ Devastating wheat fungus appears in Asia for first time. দেশি সম্প্রসারণবিদ-বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বিদেশি বিজ্ঞানীরাও সহযোগিতার জোড় বাঁধে। কৃষিগবেষণা ইনস্টিটিউট এবং এর অধীন গম গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা অভূতপূর্ব একটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। আন্তর্জাতিক গম ও ভুট্টা গবেষণা কেন্দ্র, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাকেও কাছে পাওয়া যায়। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট উদ্ভিদরোগতত্ত্ববিদ প্রফেসর বাহাদুর মিয়া ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলোজিস্ট প্রফেসর তোফাজ্জল ইসলাম অনেকটা স্বপ্রণোদিত হয়েই একাজের সঙ্গে জড়িত হন। এদের ছাড়াওসুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মাইক্রোবিয়াল পপুলেশন জেনেটিসিস্ট ড্যানিয়েল ক্রল, দ্য স্যানিসবারি ল্যাবরেটরির বায়োলজিস্ট সোফিয়েন ক্যামাউনসহ আরও অনেকের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বস্নাস্ট নিয়ে গবেষণার বিষয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) তুলনায় কিছুটা এগিয়ে ছিল। তাই ব্রির বিজ্ঞানীরাও বস্নাস্ট নিয়ে কাজ করতে এগিয়ে আসে। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে যায় প্রফেসর তোফাজ্জল ইসলামের ব্যতিক্রমধর্মী কাজকর্ম। তার উদ্যোগে সোফিয়েন ক্যামাউনের ল্যাবে গমের বস্নাস্টের জেনোম সিকুয়েন্সিং করা হয়। ফলে তিনি ও তার দলের বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সমন্বয় সাপেক্ষে তাড়াতাড়িই একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হন। আর সেটা ছিল, "Our phylogenomic and population genomic analyses revealed that the wheat blast outbreak in Bangladesh was most likely caused by a wheat-infecting South American lineage of the blast fungus Magnaporthe oryzae. তাদের গবেষণা কার্যক্রম Emergence of wheat blast in Bangladesh was caused by a South American lineage of Magnaporthe oryzae শিরোনামে ৩ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত হয় BMC Biology জর্নালে। এর পরের মাসেই বিখ্যাত প্লান্ট প্যাথলজি জর্নালে (ভলিয়্যুম ১০০ সংখ্যা ১১ পাতা ২৩৩০) কৃষি গবেষণা ও আন্তর্জাতিক ভুট্টা গবেষণা কেন্দ্র এবং আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে First Report of Wheat Blast Caused by Magnaporthe oryzae Pathotype triticum in Bangladesh  শিরোনামে একটি Abstract প্রকাশিত হয়। তাদের বক্তব্য ছিল, "Molecular analysis with MoT-specific markers and comparative genome analysis of isolates (BdBar16-1, GenBank accession no. LXON01000000; BdJes16-1, LXOO01000000; BdMeh16-1, LXOP01000000) confirmed that the wheat blast observed in Bangladesh is caused by MoT pathotype and has strong genetic identity to a strain from South America (B71, LXOQ01000000) দুই দলের বক্তব্য আসলে একই।

আমাদের দেশে ধান ফসল প্রায়ই রাইসবস্নাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়। তাই রোগটির সঙ্গে আমরা পরিচিত। সময় ও সুযোগ বুঝে এরা ধান গাছের পাতা, গিঁট, শিষ আক্রমণ করে থাকে। সুগন্ধী জাত ব্রি ধান৩৪ এ রোগের ধকল একেবারইে সইতে পারে না। আক্রান্ত হলে ফলন শূন্যের কোটায় নেমে যায় প্রায়। রোগটি Pyricularia oryzae Cavara নামক ছত্রাকজাত। এই ছত্রাকটি Fungi imperfecti গোত্রভুক্ত। এদলের একই ছত্রাকের বৈজ্ঞানিক নাম ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। ফলে কিছুটা সন্দেহ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ এ ধরনের ছত্রাকের বেলায় জীবন চক্রের স্বাভাবিক নিয়ম বেঁধে নামকরণ করা কিছুটা অসুবিধাজনক। কারণ এরা যৌন এবং অযৌন দুভাবেই জীবনচক্র সমাধান করতে সক্ষম। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃতিতে যৌন পর্যায় খুব একটা দেখা যায় না। গমের ক্ষেত্রে যে আক্রমণটা দেখা যায় তা স্পোর-কনিডিয়ার মাধ্যমে। যাহোক এই দুই পরিস্থিতিকে সামাল দিতে গিয়ে ভিন্ন নাম দেয়া হয়ে যায়। যখন অযৌন জীবনচক্র সম্পন্ন করে তখন বিজ্ঞানীরা এই ছত্রাককে Pyricularia oryzae নাম দিয়েছেন। আর যৌন জীবনচক্র অবস্থায় Pyricularia grisea। রাখা হয়। পরে Pyricularia grisea  রপরিবর্তে নাম রাখা হয় Magnaporthe grisea। এতেও বোধ হয় Taxonomist iv খুশি হতে পারেনি। আবার নতুন নাম রাখা হয় গধমহধঢ়ড়ৎঃযব ড়ৎুুধব। যাহোক পয়লা জানুয়ারি ১৯১৩ থেকে নাম পরিবর্তনের এই নিয়ম বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এখন থেকে নিয়ম হলো 'এক ছত্রাক এক নাম' তা যে অবস্থায়ই বৈশিষ্ট্যায়ন করা হোক না কেন। অতএব সাম্প্রতিকতম নাম গধমহধঢ়ড়ৎঃযব ড়ৎুুধব আর বুঝি পরিবর্তিত হবে না। আশ্চর্যজনক হলো এই গধমহধঢ়ড়ৎঃযবড়ৎুুধব ধান এবং গমের বস্নাস্ট রোগের জন্য দায়ী। এক যাত্রায় ভিন্ন ফলের মত। আক্রমণকারী প্যাথজেনগুলো অন্তত বহিরাঙ্গিক বৈশিষ্ট্যে এক। তাই বৈজ্ঞানিক নামও এক। তবে আক্রমণের প্রকৃতি এবং পোষক ভিন্ন হওয়ায় এটা নিশ্চিত যে বাইরে থেকে একরকম দেখা গেলেও ভিতরের কৌলিকতাত্তি্বক বৈশিষ্ট্যে কিছুটা হলেও ভিন্নতা আছে। ফলে শারীরতাত্তি্বকও। এজন্য ধানের বস্নাস্টকে ঙৎুুধ ঢ়ধঃযড়ঃুঢ়ব এবং গমের বস্নাস্টকে ঞৎরঃরপঁস ঢ়ধঃযড়ঃুঢ়ব হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেকে মনে করে থাকেন যে ধান ও গমের জন্য প্যাথজেন এক হলে তো ধানের বস্নাস্ট গমে বা গমের বস্নাস্ট ধানে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে গমের বস্নাস্ট কখন ওই ধানে যাবে না আবার ধানেরটাও গমে ছড়াবে না। ধানেরটা গমে কিছুটা বসার জায়গা করে নিতে পারলেও তারপরে রোগ সৃষ্টির পর্যায়ে যেতে পারবে না। গধমহধঢ়ড়ৎঃযব ড়ৎুুধব প্যাথটাইপ ভেদে ৫০ প্রজাতির বেশি দানাশস্যকে (ভধসরষু: চড়ধপবধব) আক্রমণ করার ক্ষমতা রাখে। এবং সারা পৃথিবীতেই এ ছত্রাক বিদ্যমান। এদেরেই একটি ধারা (ঞৎরঃরপঁস ঢ়ধঃযড়ঃুঢ়ব) ব্রাজিলে এবং বাংলাদেশে গমের বস্নাস্ট রোগের জন্য দায়ী বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যেহেতু গত বছরের সতর্কতা সত্ত্ব্বেও এ বছর মাঠে এ ছত্রাকের আক্রমণ দেখা গেছে। তাই এ ব্যাপারে আমাদের আরও সতর্ক হওয়ার বিষয় আছে। অর্থাৎ রোগ দমন বা রোগ যাতে না হয় বা হলেও বিস্তার না করতে পারে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমি নিজে উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিশারদ না। তাই ব্রির বিজ্ঞানী ড. আশিক ইকবালের কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যায় বলে মনে করছি। তার ভাষায় ধানের বস্নাস্ট রোগ দমনের দুটো উপায় আছে। এক: ট্রায়সাইক্লাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন ট্রুুপার, নেটিভোসহ বেশ কয়েকটি ছত্রাকনাশক স্প্রে করা; আরেক হলো বস্নাস্ট প্রতিরোধী জাত আবাদ করা। ছত্রাকনাশক ধানের বস্নাস্ট দমনে বেশ কার্যকরী। তাই এই ছত্রাকনাশকগুলো গমের বেলায় পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখা যেতে পারে। যদিও দক্ষিণ আমেরিকাতে ব্যাপকভাবে ঝঃৎড়নরষঁৎরহ জাতীয় ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে অযাচিত ব্যবহারের ফলে ছত্রাকনাশক-প্রতিরোধী উপধারার বস্নাস্ট প্যাথজেনও তৈরি হচ্ছে। অতএব এ ব্যাপারে আমাদের আগে থেকেই চিন্তা-ভাবনা করে নিতে হবে। সবচেয়ে নিরাপদ হলো বস্নাস্ট প্রতিরোধী গমের জাত উদ্ভাবন করা। তবে কাজটি মোটেই সহজ নয়। কারণ এই রোগের ধারা-উপধারার সংখ্যা অনেক বেশি। তাই ড. আশিকের ভাবনা অনুযায়ী বাংলাদেশের জন্য একটি ডিফারেনসিয়াল সিস্টেম তৈরি করতে হবে। আর তা দিয়ে বস্নাস্ট রোগের জীবাণুদের গ্রুপিং করতে হবে। জাত ভেদে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত গমের বস্নাস্টের জীবাণুগুলো তাদের সক্ষমতা অনুসারে বিভিন্ন মাত্রায় রোগ তৈরি করবে। তাই একবার জাতগুলোর উপর ভিত্তি করে জীবাণুদের, আরেকবার জীবাণুগুলোর উপর ভিত্তি করে জাতগুলোকে গ্রুপিং করতে হবে। এখান থেকে জীবাণুর প্রধান প্রধান গ্রুপ থেকে আবার সবচেয়ে শক্তিশালী জীবাণু বাছাই করে জাত উদ্ভাবনের কাজে এগুতে হবে। আবার জাতগুলোর প্রতিটি গ্রুপ থেকে একটি করে জাত নিয়ে কয়েকটি জাত মিলে একটা সেট তৈরি করতে হবে, যা পরবর্তীতে জীবাণুর রেস বা ধারা নির্ণয়ে ব্যবহৃত হবে। বিজ্ঞানের ভাষায় নির্বাচিত জীবাণুগুলোর সেটকে ডিফারেনসিয়াল আইসোলেট এবং গমের জাতগুলোকে ডিফারেনসিয়াল ভ্যারাইটি বলে অভিহিত করা হয়েছে। আর একত্রে এদেরকে বলা হয় ডিফারেনসিয়াল সিস্টেম। এটাই হলো রোগপ্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনের প্রথম ধাপ। এর উপর নির্ভর করে আমাদের গমের প্রজননবিদরা অগ্রসর হতে পারেন। সহজে ভালো কিছু পাওয়ার জন্য ড. আশিকের এটি একটি প্রস্তাবনা বলে আমি মনে করি। হয়তো আরও ভালো কোনো পরামর্শ থাকতে পারে। জিন প্রকৌশলের মাধ্যমেও হয়তো করা সম্ভব। সে কাজের শুরু হয়েছে বলে মনে করি। তবে বায়োটেকনোলজিস্টরা ডিফারেনসিয়াল সিস্টেম এর সুযোগটা গ্রহণ করলে তাদের কাজ কিছুটা সহজ হতে পারে বলে ব্রির এই বিজ্ঞানী মনে করেন।

শেষ কথা হলো_ বিজ্ঞানীরা বলছে যে ছত্রাকটি মারাত্মক। আবার তারাই বলছে আক্রমণের আগে থেকে যদি ঠিকমতো তদারকি করা যায় তবে রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আমাদের বিজ্ঞানীরা এ কাজটিই শুরু করেছে। এজন্য যেমন প্রায়োগিক গবেষণা চলছে, তেমনই মৌলিক গবেষণাও চলতে থাকবে। পাশাপাশি মাঠের তদারকি ও চাষিদের সচেতন করার কাজও এগিয়ে নিতে হবে। তাহলে আর কোন অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।

 

[লেখক : মহাপরিচালক (সাবেক), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিউট]

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.