logo

orangebd logo
নেত্রকোনায়
মরাধনু নদীর ৩ কোটি টাকার মাছ লুট
জেলে সমিতির সম্পাদকের সই জাল করে রিট
আকাশ চৌধুরী নেত্রকোনা থেকে ফিরে

জেলা প্রশাসনের অসৎ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এক বছরে নেত্রকোনা জেলার মরাধনু নদীর প্রায় ৩ কোটি টাকার মাছ লুটে নিয়েছে দুষ্টুচক্র। একটি জেলে সমিতির সম্পাদকের স্বাক্ষর জাল করে ওই দুষ্টুচক্র আদালতে রিট পিটিশন করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, যার সঙ্গে প্রশাসনের দু-একজন অসৎ কর্মকর্তার পরামর্শ ও অাঁতাত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি জানাজানি হলে সমিতির সম্পাদক তার স্বাক্ষর জাল করার বিষয়টি ভূমি সচিব ও জেলা প্রশাসনকে অবহিত করেন। তবে এখন পর্যন্ত ওই দুষ্টুচক্রের সদস্যদের খুঁজে বের করা হয়নি। এতে একদিকে দুর্নীতিবাজরা আর্থিক লাভবান হয়েছে এবং সরকার হারিয়েছে তার রাজস্ব।

নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরি উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে মরাধনু নদীর সীমানা। এ নদীর দখল নিয়ে পূর্বে একাধিকবার সংঘর্ষ ও হানাহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে বর্তমানে তা তেমন না হলেও মূলত প্রকৃত জেলেরা এর ভোগ করতে পারে না। তাদের সমিতির ব্যানারে ইজারা আনলেও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদেরও টাকা ছাড়া অংশ (শেয়ার) দিতে হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মরাধনু জলমহালটি বাংলা সনের ১৪১৭ থেকে ১৪২২ সন পর্যন্ত ছয় বছর মেয়াদের ইজারা পায় মোহনগঞ্জ উপজেলার বরান্তর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লি.। জেলা প্রশাসনের চুক্তিপত্রে দেখা গেছে ইংরেজি ২০১১ সালের ৪ এপ্রিল সমিতির সম্পাদক মুকুল বর্মণকে জলমহালটি প্রথম চার বছর বার্ষিক ১২ লাখ ৮৩ হাজার একশ' টাকা ও পরের দুই বছরে ১৬ লাখ ৩ হাজার ৮৭৫ টাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ইজারা প্রদান করা হয়। এরপর বাংলা ১৪২২ সনে তাদের ইজারার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে পুনরায় ১৪২৩ থেকে ১৪২৮ সন পর্যন্ত ফের ছয় বছরের ইজারার জন্য খালিয়াজুরি উপজেলার রাজিবপুর গ্রামের রাজিবপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাুচিত হয়। এ বিষয়ে ইংরেজি ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. তরুণ কান্তি শিকদারের সভাপতিত্বে জেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। আর তখনই সর্বোচ্চ দরদাতা

হওয়ার পরও বাদ সাজে রাজিবপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লি.। ওই সভার সিদ্ধান্তে জানানো হয়, মোট চারটি সমিতি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ইজারা নেয়ার জন্য অংশ নেয়। এর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে উত্তর বরান্তর নবজাগরণ মৎস্যজীবী সমিতি, তৃতীয় আসাদপুর নূরানী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি ও সর্বনিম্ন দরদাতা হয় বরান্তর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। তবে সর্বোচ্চ দরদাতাকে দেয়া হয়নি সেই ইজারা।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজিবপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লি. এর সম্পাদক বসুদেব বর্মণ বলেন, আমার সমিতি সরকারকে সর্বোচ্চ রাজস্ব দিতে চাইলেও আদালতের একটি রুলনিশির কারণে আমাকে দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, বরান্তর সমবায় সমিতি উচ্চ আদালতে এ রিট করে। তবে এ রিটের কথা অস্বীকার করেন সমিতির সম্পাদক মুকুল বর্মণ।

২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি জেলা প্রশাসনের জলমহাল শাখার সভায় জানানো হয়, মরাধনু জলমহালটি ইজারা সংক্রান্ত বিষয়ে ইজারাদার সমিতি বরান্তর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লি.-এর সম্পাদক মুকুল চন্দ্র বর্মণ মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে ১৩৮৩/১১নং রিট মামলা করেন। রিটে বলা হয়, জলমহালটির দখল সরেজমিনে বুঝিয়ে দেয়ার পর ইজারাদার দশদিন ভোগ-দখল করেছেন। ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সভায় বলা হয়, ?এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনান্তে যেহেতু ১৩৮৩/১১ রিট মামলায় প্রতিপক্ষকে (সরকার) ১৪১৭ থেকে ১৪২২ বাংলা সনের ইজারাদারকে রিটকারী সমিতি দখল হস্তান্তরের তারিখ হতে সাকুল্য ইজারাদার মেয়াদকাল ভোগ করার বিষয়ে নির্দেশাত্মক আদেশ প্রদান করা হয়েছে এবং ১১২৯৬/১৫নং রিট মামলায় জলমহালটি ভোগদখল বিষয়ে বর্তমান ইজারাদার সমিতি রিটকারী বরান্তর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে কোন বাধা সৃষ্টি করা যাবে না মর্মে নির্দেশাত্মক আদেশ প্রদান করা হয়েছে, সেহেতু আলোচ্য জলমহালের ইজারা কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রেখে জলমহলালের ইজারা কার্যক্রম নির্বিঘ্নে রাখার স্বার্থে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের ১৩৮৩/১১ এবং ১১২৯৬/১৫নং রিট মামলার আদেশ প্রত্যাহারসহ মামলা দুটি সরাসরি ডিশমিশ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিজ্ঞ সলিশির মহোদয়কে অনুরোধ জানিয়ে বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।? এ সিদ্ধান্ত গৃহীতের আগে সভায় জেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির উপদেষ্টা স্থানীয় সংসদ সদস্য রেবেকা মমিনের ১৩.০১.২০১৫ ইং তারিখের একটি পত্র উপস্থাপন করা হয়। পত্রে তিনি বলেন, ইজারাদার সমিতি সাকুল্যে টাকা পরিশোধের পর দশদিন ভোগ দখল করায় তাদের ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি বিবেচনা করে এবং আদালতের নির্দেশনার আলোকে বর্তমান লিজের অনুকূলে ১৪২২ বাংলা সনের নির্ধারিত ইজারা মূল্যর শতকরা ২৫ ভাগ বর্ধিত হারে সমন্বয় করতঃ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ হতে জলমহালটি ইজারা দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। আদালতের নির্দেশনা ও সংসদ সদস্যের অনুরোধে অতিরিক্ত আরও এক বছর অর্থাৎ ১৪২৩ সন ভোগ-দখল করে মাছ আহরণ করা হয় বরান্তর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির নামে। তবে সবচ্থে অবাকের বিষয় হলো, যে সমিতির নামে আদালতে রিট হয়েছে?? এবং সংসদ সদস্য সুপারিশ করেছেন সে সমিতির সম্পাদক এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।

যোগাযােগ করা হলে সমিতিটির সম্পাদক মুকুল বর্মণ অভিযোগ করেন, একটি চক্র তার স্বাক্ষর জাল করে আদালতে রিট করে জলমহালটির মাছ লুটপাট করেছে। বিষয়টি তিনি পৃথকভাবে ভূমি সচিব ও জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আমি যদি আদালতে রিট করতাম তাহলে ১৪২৩ থেকে ১৪২৮ সনের ইজারার জন্য পুনরুায় আবেদন করলাম কি করে? নতুন করে ওই আবেদনে জলমহালের বিপরীতে তার সমিতি রাজস্বের দিকে চতুর্থ স্থানে ছিল। মুকুল জানান, জালিয়াতির বিষয়টি তিনি অবগত হওয়ার পর গত বছরের ২৯ আগস্ট তিনি নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। এতে তিনি বলেন, ১৪২২ বাংলা সনের ৩০ চৈত্র তার ইজারার বিলুপ্তি ঘটে। তার সঙ্গে যারা অংশীদার ছিলেন তারা সুপরিকল্পিতভাবে ১৪২৩ সনের ইজারার জটিলতা সৃষ্টির উদ্দেশে আমার স্বাক্ষর জাল করে হাইকোর্টে রিট করে বলে আমি জানতে পারি। উক্ত মামলার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না এবং ১৪২৩ সনে আমি কোন ভোগ দখলে নেই। যারা আমার সমিতির নাম ভাঙিয়ে ভোগ-দখলে আছে তাদের চিহ্নিত করে জলমহালটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনা হোক। তবে এ অভিযোগ করার পরও জড়িতদের শনাক্ত করে কোন ব্যবস্থুা নেয়া হয়নি। ফলে সরকার কয়েক লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আর প্রায় ৩ কোটি টাকার মাছ লুটেছে জালিয়াতচক্র।

জানতে চাইলে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ড. মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, আমাদের কাছে অনেক অভিযোগ আসে। দীর্ঘমেয়াদি জলমহাল ইজারার বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয় তদারকি করে। যদি এ সংক্রান্ত অভিযোগ এসে থাকে তাহলে তা ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close