logo
ঢাকা বুধবার, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, ২ শাবান ১৪৩৪, ১২ জুন ২০১৩
logo
logo
উৎসের সন্ধানে
জীবনকে ফিরে পাব, না কি পৃথিবীকে বিদায় জানাব
শামছুজ্জামান সেলিম
কথাগুলো অনেকটা স্বগতোক্তির মতো করে উচ্চারণ করেছিলেন একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি। ধানমন্ডির একটি ডায়াবেটিক সেন্টারে আমি তার পেছনেই দাঁড়িয়েছিলাম লাইন রক্ষায়। কাউন্টারে একজন কর্মী হিসাব করে 'টেস্টের' টাকা জমা নিচ্ছেলেন। ভদ্রলোকের হিসেবে আসল ৪ হাজার ১৪৫ টাকা। আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, আমার বা কত আসে! অন্যমনস্ক অবস্থা কাটতেই দেখলাম ভদ্রলোক কাউন্টার ত্যাগ করছেন। তিনি 'টেস্ট' করাবেন না। লাইন ছেড়ে যাওয়ার সময়ে আমি তার স্বগতোক্তি শুনি।

দু'দশক ধরে ডায়াবেটিক হাসপাতালে যাতায়াত করি। এই সুবাদে কত মানুষকেই না চিনি! তবে সবার নাম মনে থাকে না। ভদ্রলোককে চেনা চেনা মনে হলো। পরে মনে পড়ল, ভদ্রলোক তো বাংলা সড়কে থাকেন। জনতার মাথার ওপর দিয়ে একটু চোখ ঘুরিয়ে নিতেই তার দেখা পেলাম। স্ত্রীর পাশে বসে সলাপরামর্শ করছিলেন। এবার তিনিই আমাকে বললেন, 'ভাই আমাকে চিনতে পারলেন না?' বললাম, এবার চিনেছি। রিটায়ার করেছেন বেশ ক'বছর হলো। তিনি যেন মনের দুঃখটা ঝেড়ে বলার লোক পেলেন। আমিও শুনতে আগ্রহী ছিলাম।

চিকিৎসা খরচ বহন করা ভদ্রলোকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বামী-স্ত্রী দু'জনেরই ডায়াবেটিক। শুরুতে তেমন কোন খরচই ছিল না ডায়াবেটিকের। বারডেম হাসপাতালে গিয়ে বইটা জমা দিয়ে সিরিয়াল নিলেই হতো। বেশকিছু দিন হলো ঢাকা শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে 'সাব-সেন্টার' খোলা হয়েছে। শুরুতে সাব-সেন্টারগুলো রোগীপ্রতি বিশ টাকা নেয়া চালু করল। আর আজ, বড় ডাক্তারের 'দুইশ টাকা', মেজো ডাক্তারের 'একশ টাকা', ছোট ডাক্তারের 'পঞ্চাশ টাকা' ফি নেয়া হয়। এই সে দিন পর্যন্তও ছয় মাস বা বছরে একবার 'লিপিড ও ক্রিটেনিন' টেস্ট করা হতো। খরচ বেশি ছিল না। সাকল্যে চারশ' থেকে পাঁচশ' টাকাতেই শেষ করা যেত। আর এখন, চার হাজার টাকার ওপরে গুনতে হবে? পেনশনের টাকা দিয়ে তো আর কুলোয় না! দেখুন না, আমাকে সাতটা টেস্ট দিয়েছে!! সবগুলোই করতে হবে। না হলে ডাক্তার রোগী দেখবেন না। আগে তো শুধু রক্ত দিলেই চলত। এই সাতটা টেস্টের মধ্যে পাঁচ-ছয়টিই অযথা। রোগীর পকেট থেকে টাকা কেড়ে নেয়া। গোপন খবর হলো, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডাক্তার সাহেবদের বলে দিয়েছেন রোগীদের 'টেস্ট' দিতেই হবে। এ এক নোংরা বাণিজ্য! এই বুড়ো বয়সে হাসপাতালে আসি ডায়াবেটিক কন্ট্রোল করে জীবনের স্বাভাবিকতা ফিরে পেতে। কিন্তু তা তো আর সম্ভব হচ্ছে না। পৃথিবীকে 'গুডবাই' বলা ছাড়া উপায় কি? গেট দিয়ে বের হবেন? দেখবেন, একদল তরুণ মেডিকেল ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় জোর করে আপনার হাতের বইটা নিয়ে দেখতে থাকে, ডাক্তার সাহেব কি ওষুধ লিখেছেন! কারণ তার কোম্পানি থেকে ডাক্তার সাহেবকে বড়সড় 'গিফ্ট' দেয়া হয়েছে। নুন খেয়ে ডাক্তার নেমক হালালি করছেন কিনা তা তো চেক করতেই হবে! এ পর্যন্ত বলেই ভদ্র লোক হেসে ফেললেন। এ হাসি সুখের হাসি নয়। অতি দুঃখে হাসি দিয়ে তিনি কান্নাকে ঢেকে দিলেন।

এই একই অভিজ্ঞতা আমারও। কারণ একই প্রক্রিয়ার শিকার আমিও। ভদ্র লোক না বললে আমি একইভাবে কথাগুলো বলতে পারতাম। চিকিৎসা সেবা পেতে এসে উৎপাতের শেষ এখানেই হয় না। বড় ডাক্তারের কাছে 'লাইন দিয়ে' বসে আছেন। দেখবেন, এটেনডেন্ট সিরিয়াল ব্রেক করে মাঝে মধ্যেই এক দু'জন করে রোগী ঢুকিয়ে দিচ্ছে। জনপ্রতি পঞ্চাশ-একশ' করে তার বাড়তি আয় হয়ে যাচ্ছে! ক্লান্ত-শ্রান্ত বৃদ্ধ দুর্বল মানুষ কতই আর প্রতিবাদ করবেন!! প্রতিবাদ করলে ডাক্তার সাহেবরা ওই এটেনডেন্টের পক্ষই নেন। ওখানে প্রতিবাদ করলে ডাক্তার সাহেবদের নাকি পবিত্রতার হানি ঘটে!! শাবাশ 'পবিত্রতা'!!!

চিকিৎসাসেবা দিতে আসা ডাক্তার সাহেবদের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে কথা বলাও আজকাল বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিককালে এ নিয়ে চট্টগ্রামে হুলুস্থ্থূল কা- ঘটে গেল। সেজন্য 'ছা পোষাদের' ভয়ে ভয়ে এসব কথা বলতে হয়। বলবেন, ডাক্তার সাহেবদের মধ্যে কি প্রকৃত মানুষ নেই? অবশ্যই আছেন। কিন্তু তারা 'বিশাল সমুদ্রের মধ্যে ক'ফোঁটা পানির বিন্দুর মতো'। চিকিৎসাসেবা নিয়ে এই 'বিলাপ' শুনতে শুনতে সেই ছোট বেলার একটা ঘটনা স্মৃতি হয়ে জেগে উঠল। ১৯৫৫-৫৬ সাল হবে হয়তো। তখন আমি খুবই ছোট। পাবনা শহরে একজন ডাক্তার ছিলেন। সঠিক নাম তার আজ আমার মনে নেই। কিন্তু অবয়বটার অনেকটাই মনে আছে। ছোটখাটো গোলগাল চেহারার এই মানুষটিকে পাবনা শহরের মানুষ সম্ভবত জিতেন ডাক্তার বলেই ডাকতেন। মাঝে মধ্যেই তিনি তার বাইসাইকেলটি আমাদের সাধুপাড়ার বাড়ির বৈঠক খানায় রেখে নদী পার হয়ে চরে চলে যেতেন। বড়দের মুখে শুনেছি, চরের গরিব মানুষের তিনি চিকিৎসা করতেন। নিজের 'পয়সায়' ওষুধ তো কিনেই দিতেন, সঙ্গে কখনো কখনো 'পথ্য'ও দিতেন। সাহেবদের মতো কোর্ট প্যান্ট টাই পরে মাথায় সোলার হ্যাট দিতেন। প্রায় ছয় দশক পরে শুধু ডাক্তার সাহেবরাই নয়, এ কথা শুনে রোগীরাও হয়তো হাসাহাসি করবেন। 'এমন পাগল কি(!)' দুনিয়ায় আছে!

হ্যাঁ, এমন অনেক পাগলকেই এ বয়সে আমি দেখেছি। এই 'পাগলরা' চেয়েছিলেন 'মুক্ত মানুষের মুক্ত জীবন'। নিবন্ধে আলোচিত 'ভদ্র লোকটিও' তরুণ বয়সে এই 'পাগলদের দলেই' ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি দেখলেন, তার দল বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। দলে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও করিৎকর্মা ছিলেন। সোৎসাহে তিনি বললেন, জানেন, '৭১ সালে যে চীনাপন্থা ত্যাগ করতে পেরেছিলাম তার জন্যে আমি নিজেকেই নিজেই ধন্যবাদ জানাই। আপনাকেও ধন্যবাদ যে কোন 'পন্থা' আপনাকে ত্যাগ করতে হয়নি! বললেন, কমিউনিস্ট ও বাম আন্দোলনের 'অন্ধকার দিকগুলো' নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা নাকি 'অপরাধ'! এতে নাকি তরুণ কর্মীরা হতাশ হয়ে দল ছেড়ে দেবেন! বলুন তো, ওই 'অন্ধকার ও পচাগলা' দিকগুলো যদি আন্দোলন ও সংগঠন থেকে ঝাড়ু মেরে বিদেয় করা না যায় তাহলে 'মুক্তি আসবে কি করে'? 'মুক্ত মানবের মুক্ত জীবন' প্রতিষ্ঠা করা যাদের জীরনের লক্ষ্য তাদের দলের নেতাদের ব্যক্তি জীবনের নোংরামি আমি দেখেছি। ওই নৈরাজ্যবাদী জীবনাচার বজায় রেখে নিজেকে 'বিপ্লবী' বলে দাবি করার অধিকার কি কারও থাকতে পারে? ইতোমধ্যে আমি মনে মনে প্রমাদ গুনতে শুরু করে দিয়েছি। ভদ্র লোক কার কথা বা কি বলতে চাচ্ছেন তা ঠিকমতো বুঝতে পারছিলাম না! মনে হলো, এক অসাধারণ শ্রোতাকে তিনি পেয়ে গেছেন। মনের সব বেদনা, সব যন্ত্রণাকে উগড়ে দিতে পারবেন।

বলতেই থাকলেন, জানেন, ১৯৭২ সালে কলেজে ফিরে এসে ইন্টার পাস করার পর সরকারি চাকরিতে ঢুকে পড়ি। কিন্তু সবসময়ের জন্য মনটা পড়ে থাকত ওই কমিউনিস্ট আন্দোলনে। সেই ১৯৬৪ সালে 'ইস্পাত' পড়ে ফেলি। আহ্, পাভেল করচাগিন, আমাকে পাগল করে দিয়েছিল। সেই অসাধারণ উক্তি, 'যেহেতু মানুষ জীবনে একটি বারের জন্যই বাঁচতে পারে, সেজন্য তাকে এমনভাবে বাঁচতে হবে.....মৃত্যুকালে সে যেন বলতে পারে আমার সমস্ত জীবন, সমস্ত শক্তি উৎসর্গ করেছি মানব জাতির মহোত্তম আদর্শ মানব মুক্তির জন্য'। বুঝলাম, ভদ্রলোক অন্য জগতে চলে গেছেন। 'ইস্পাত' থেকে যেটুকু উদ্ধৃত করলেন তার সবটা ঠিকঠাক মতো করলেন কিনা তাতে সন্দেহ রয়ে গেল। তবুও তাকে মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম, যে এই বয়সে এতটুকু মনে রেখেছেন। বললেন, 'ইস্পাত' পড়েছেন? হ্যাঁ সূচক উত্তরের পর বললাম ১৯৬৬ সালে 'ইস্পাত' পড়েছি। তখন আমি দশম শ্রেণীতে পড়ি। নিকলাই অস্ত্রভস্কি আমাকেও 'পাগল' করেছে। এখনও 'মুক্তির স্বপ্ন' নিয়ে বেঁচে আছি।

ভদ্রলোক আবার শুরু করলেন। বলুন তো, ১৪ বছর বয়সী করচাগিন কি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ বুঝতেন? 'বলশেভিকদের' জীবনাচার তার আবেগে নিশ্চয়ই প্রচ- ঝড় তুলেছিল, যার কারণে ওই বয়সে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে গেল নিজের অজান্তেই। সে তখন 'রেড আর্মি'। দারুণ ব্যাপার! জানেন, নিকলাই অস্ত্রভস্কি আমার অজান্তেই আমাকে 'বলশেভিক' বানিয়ে দিয়েছিল!! মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ তো অনেক পরে বুঝেছি। তীব্র আলো তো পোকা মাকড়কে আকর্ষণ করে। বিপ্লবী ব্যক্তিত্বও সেভাবে তরুণ শক্তিকে আকর্ষণ করে মানব মুক্তির লড়াইয়ে। অবসর বয়েসে ওই লাল দুর্গের দিকেই তাকিয়ে থাকি। কোথায় সেই তরুণ সমাজ? সবাই তো শুরুতেই নেতা হতে চায়! টকশো আর ফেসবুকেই 'বিপ্লব(!)' করতে চায়। মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বললাম, শুধু তরুণদের অভিযুক্ত করছেন কেন? সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, না, শুধু তরুণরা হবে কেন! বলেছি না-আকর্ষণের 'তীব্র আলো কই? নেতাদের যা করতে দেখে ওরা তা-ই করে। দর্শন আর জীবন যদি সঙ্গতিপূর্ণ না হয় তাহলে সব প্রচেষ্টাই ভ-ুল হয়ে যায়। মেধাহীনরা নেতাদের পেছনে পেছনে ঘুর ঘুর করতে থাকে। এক দল 'চামচাই' তৈরি হয়, 'বিপ্লবী' হয়না।

এবার মনে হলো ক্ষান্ত দেয়ার সময় হয়েছে। দেখলাম তার স্ত্রীও উসখুস করতে শুরু করেছেন। বললাম, জীবন ও দর্শনকে যখন এতো গভীর থেকে বুঝতে পারেন তখন কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে চলে গেলেন কেন? কেন যে সরে এলাম এত বকবকানি থেকে যদি না বুঝে থাকেন তা হলে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই। বললাম তো করচাগিনের মতো 'জীবনকে ভালো বাসি'। 'চলে যাইনি-সরে এসেছি।' ডায়াবেটিকের চিকিৎসা করাতে না পেরে 'জীবনের দৈন্যদশায়' কাতর হয়ে বিলাপ করছি। সমাজের ওপর তলার এই অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দাঁড় করাতে পারলাম না। এটা তো ব্যর্থতা। মানুষ কি ব্যর্থ হয় না? কিন্তু ব্যর্থতা উদাহরণ হয় না। এখানেই আমার যত ভরসা। দম্পতি উঠে দাঁড়ালেন। মনের গভীরে একটা স্বস্তিবোধ করলাম, তা হলে আমাদের সমাজে এখনো 'মানুষ' আছেন। কিন্তু একটা খটকাও থেকে গেল। এরা তো বৃদ্ধ, পৃথিবীকে 'গুডবাই' বলতে চাচ্ছেন!

১১.০৬.১৩
( লেখাটি পড়া হয়েছে ১৮৬ বার )
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
এই সংখ্যার পাঠক
৭৮০০৭
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান ।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৯৫৭৪৭২২
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright The Daily Sangbad © 2015 Developed By : orangebd.com.
close
close