logo

orangebd logo
৫০ টাকায় সমাধানকৃত প্রশ্ন বিক্রি
প্রশ্ন ফাঁস অগ্রণী ব্যাংকের পরীক্ষা স্থগিত
সিদ্ধান্ত হয়নি সকালের সেশনে পরীক্ষার বিষয়ে
সেবিকা দেবনাথ ও রোকন মাহমুদ

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে গত বৃহস্পতিবার রাতেই অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র চলে যায়। অনেকে ফাঁসকৃত ওই প্রশ্নপত্র বেচাকেনাও করেছেন। সাধারণ বাদাম বিক্রেতাও গতকাল চাকরি প্রত্যাশীদের কাছে ৫০ টাকায় সমাধানকৃত প্রশ্নপত্র বিক্রি করেছেন। অথচ এ বিষয়ে কিছুই জানতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রেই সকালের শিফটে এক লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়া হয়। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে বিভিন্ন মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ার পর শেষ মুহূর্তে বিকেলের সেশনের ওই নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সকালের সেশনে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া পরীক্ষার বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত এখনও নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় দুই লাখেরও বেশি চাকরি প্রার্থী রয়েছেন অনিশ্চয়তায়।

সরকারি মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষা ছিল গতকাল। সকাল ও বিকাল দুই শিফটে মোট দুই লাখ ৩ হাজার চাকরি প্রত্যাশীর অংশ নেয়ার কথা ছিল। সকালের শিফটে ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এবং বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিকালের শিফটে পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। সকালের শিফটে অংশ নেন প্রায় এক লাখ চাকরি প্রত্যাশী। আর বিকালে বাকি ২ লাখ ৩ হাজার চাকরি প্রর্থীর পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সকালের পরীক্ষা হলেও হয়নি বিকালের শিফটের পরীক্ষা।

গতকাল সকাল থেকেই বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি হয় বলে জানা যায়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর না জানায় সকালের শিফটের পরীক্ষা হয়ে যায়।

রাজধানীর তিতুমীর কলেজের গেটে এক বাদাম বিক্রেতা বলেন, 'মামা সকালে ৫০ টাকা করে আম?াগর সামনেই প্রশ্ন বিক্রি হইছে। আমরাও বিক্রি করছি। এসব হইলে কেমনে পরীক্ষা হইবো কন?'

গোপীবাগ থেকে তিতুমীর কলেজে পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন এক চাকরি প্রত্যাশী। জটলা ঠেলে কলেজের মূল গেটের বাম পাশের দেয়ালে টাঙ্গানো সিট প্ল্যান দেখার চেষ্টা করছিলেন। তখনই পাশের অন্য চাকরি প্রত্যাশীরা তাকে বললেন, 'আপা সিট প্ল্যান দেখে আর কী করবেন, পরীক্ষা তো হবে না।'

কথাটা শুনে ওই চাকরি প্রত্যাশী অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। বিষয়টা জানার চেষ্টা করলেন। সবাই তাকে একই কথা

বললো। তবুও সিট প্ল্যান দেখে কলেজের বিজ্ঞান ভবনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি। ওখানে গিয়ে শুনতে পান মাইকিং করা হচ্ছে 'অনিবার্য কারণবশত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। আপনারা যারা চাকরির পরীক্ষা দিতে এসেছেন তারা চলে যান। পরে আপনাদের জানানো হবে।'

আশাহত মন নিয়ে ওই চাকরি প্রত্যাশী কলেজ থেকে বেরিয়ে যেতে লাগলেন। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়কার এক ক্লাসমেটের সাথে তার দেখা হয়। জানা যায় ওই মেয়েটি গতকাল সকালেই পরীক্ষা দেয়ার জন্য সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছেন।

গোপীবাগের ওই চাকরি প্রত্যাশী বলেন, 'প্রশ্ন ফাঁসের খবরটা বাসাতেই পেয়েছিলাম। বন্ধুরা ফোন করে জানিয়েছে প্রশ্ন লাগবে কিনা। তাদের কথার গুরুত্ব দেইনি। কেননা প্রতিবারই প্রশ্ন ফাঁসে অভিযোগ ওঠে। কিন্তু পরীক্ষা তো হয়। তা ভেবেই অসুস্থ হয়েও পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম। কিন্তু এখন খুবই কষ্ট লাগছে।'

সিরাজগঞ্জ থেকে আগত ওই চাকরি প্রত্যাশী বলেন, 'এই পরীক্ষা দেয়ার জন্যই আজ সকালে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছি। এখানে এসে শুনছি পরীক্ষা হবে না। মাইকিং করে যদিও বলা হচ্ছে অনিবার্য কারণবশত কিন্তু আমরা তো জানি প্রশ্ন ফাঁসের কারণেই পরীক্ষা হচ্ছে না। আমরা যারা সাধারণ চাকরি প্রত্যাশী তাদের অপরাধটা কোথায়?'

সকালের শিফটে পরীক্ষা দিতে শেরপুর থেকে গত বৃহস্পতিবার রাতে উত্তরায় এক আত্মীয়ের বাসায় এসে উঠছেন এক চাকরি প্রত্যাশী। তিনি সংবাদকে বলেন, 'আমার পরীক্ষার কেন্দ্র ছিলো মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই শুনছিলাম প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। তবুও ভরসা নিয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে মনটাই ভেঙ্গে গেছে। দেখলাম অনেকেই ফোনে ফাঁসকৃত প্রশ্ন দেখছে। অনেকে ওই প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে না পারলে তাহলে পরীক্ষা নেয়ার নামে এই তামাশা করা কেন? সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা কেন?'

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানায়, 'বৃহস্পতিবার রাতে আমার এক বন্ধু আমাকে প্রশ্ন পেয়েছে বলে জানায়। অনেকটা কৌতুহলবশতই তার কাছে তা দেখতে চাই। সে শর্ত দেয় যে তাকে সকালের নাস্তা খাওয়ালে সে আমাকে প্রশ্ন দেবে। আমি তাতে রাজিও হই। পরে সে আমাকে ফেসবুকের ইনবঙ্ েপ্রশ্ন দেয়। সকালে হলে গিয়ে দেখি হুবহু একই প্রশ্ন। আমি নিজেকে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।'

জানা যায়, সরকারি ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মকর্তা নিয়োগে ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি নামের একটি কমিটি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে কমিটির সচিবালয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মোশারফ হোসেন সচিবালয়ের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে পরীক্ষা গ্রহণ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগকে। বিভাগটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু তালেবই বিষয়গুলোর দেখছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ থেকে জানা যায়, বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছে। তবে সকালের শিফটের পরীক্ষার বিষয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।

এর আগে গত ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছিল। এছাড়া জনতা ব্যাংকের দুই সেশনের পরীক্ষার প্রশ্ন তুলনামূলক পার্থক্য অনেক বেশি থাকার অভিযোগও উঠেছিল।

পরীক্ষা শুরুর আগেই একটি পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে খবর আসে। ফেসবুকেও অনেকে 'ফাঁস হওয়া প্রশ্নর' ছবি দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই পরিস্থিতিতে সকালের অংশের পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ বিকালের শিফটের পরীক্ষা স্থগিত করে। এর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির সদস্য সচিব মোশারফ হোসেন খানের কাছে একটি সংবাদ মাধ্যম থেকে সকালে জানতে চাইলে তিনি প্রচ- ব্যস্ততা দেখিয়ে এ বিষয়ে কথা শুনতে রাজি হননি। তিনি ওই সময় বলেন, আমি পরীক্ষা নিয়ে প্রচ- ব্যস্ত। মাথা অনেক গরম এখন এসব বিষয় শোনার সময় নেই।

প্রশ্ন ফাঁসের প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবু তালেব বলেন, বিকালের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এ কারণে আমরা রিস্ক নিতে চাচ্ছি না। অভিযোগটি আমরা যাচাই-বাছাই করব। পরে সুবিধাজনক সময়ে পরীক্ষা নেয়া হবে। সকালে নেয়া পরীক্ষার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই সেশনের প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। তারপরও বিষয়টা খতিয়ে দেখছি।

এ বিষয়ে সিলেকশন কমিটির সদস্য এবং অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখতকে মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে জনসংযোগ থেকে বলা হয়েছে অগ্রণী ব্যাংকের পরীক্ষার বিষয়ে তাদের কোন দায়িত্ব নেই। পরীক্ষা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করছেন তারা।

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close