logo

orangebd logo
বন্যাকবলিত হাওরাঞ্চলে
বাঁচার লড়াই লড়ছেন কৃষক
* বিষাক্ত হয়ে পড়েছে হাওরের পানি * ভেসে উঠছে মৃত মাছ ও হাঁস
আকাশ চৌধুরী, সোহান আহমেদ কাকন, লতিফুর রহমান রাজু, মোস্তফা কামাল ও আকবর হোসেন হাওরাঞ্চল থেকে

দিনের পর দিন হাওরের ফসল ও বাঁধ রক্ষায় লড়ছেন কৃষকরা। প্রতিদিনই দেখা দিচ্ছে নতুন নতুন সমস্যা, তবুও হাল ছাড়ছেন না। শেষ দেখে ছাড়বেন। হাজার হাজার শ্রমিক স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে পাকনার হাওরের সব বাঁধ নিয়ন্ত্রণ রাখলেও মাঝে মাঝে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। পাহাড়ি ঢল, আর নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে হাওর পাড়ের সমান সমান হয়ে গেছে পানি। রাতের বৃষ্টির পর গতকাল সকাল থেকে ডাইলা, কাউয়ার বাধা, পাতিলচুরা, ফুইল্লাটনা, করাইত্তা, গাউত্তা, উড়াসহ পাকনার হাওরের বেশ কয়েকটি স্থানে ২০ থেকে ৫০ ফুট জায়গা নিয়ে ২ থেকে ৪ ইঞ্চি আবার কোথাও ৮ ইঞ্চি উঁচু হয়ে পানি প্রবেশ করে। তবে সকাল থেকে হাওরবাসী বাঁধ মেরামতের কাজে লেগে যান, দুপুরের পর বাঁধে নিয়ন্ত্রণ আনেন।

এদিকে বন্যাকবিলত হাওরাঞ্চলের কৃষকদের একের পর এক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রথমে বিনষ্ট হয়েছে ধান। এরপর পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান পচে মৎস্যভা-ার খ্যাত হাওর-নদীর মাছ ও হাঁস মরে ভেসে উঠছে। পানি দূষিত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। পরিবেশ দূষণে এখন জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পড়েছে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে হাওর এলাকার মানুষ। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে হতদিরদ্র কৃষকদের মধ্যে ১৫ কেজি করে চাল বিতরণ করা হলেও বেকায়দায় মধ্য ও উচ্চবিত্ত কৃষক। ত্রাণের সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়ে তারা তা গ্রহণ করতে পারছেন না। ইতোমধে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদসহ সরকারের কয়েক মন্ত্রী হাওর এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের নানা আশ্বাসও দিয়েছেন। তবে কৃষকদের সাফ বক্তব্য, যাদের কারণে প্রতি বছর হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাচ্ছে, এসব দুর্নীতিবাজদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। কৃষকদের মধ্যে যখন এমন দাবি ও হাহাকার, ঠিক এরই মধ্যে জনসম্মুখে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলেছেন দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল। হাওরের মানুষ দুর্গত এলাকা দাবি করায় সচিব ক্ষেপে যান সুনামগঞ্জের একটি আলোচনা সভায়।

গত সোমবার থেকে নেত্রকোনা জেলার মহোনগঞ্জের বড় হাওর ডিঙ্গাপুতায় মাছ মরে পানিতে ভাসতে শুরু করেছে। পানিও অনেক দুর্গন্ধ হয়ে পড়েছে। অনেকে গুরু ধোয়ানো নিয়েও আতঙ্কে আছেন। নিজেরাও এ পানি ব্যাবহার নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

তেঁতুলিয়া গ্রামের মুস্তাফিজ বলেন, আমরা হাওর পাড়ের মানুষ। হাওরের পানি দিয়েই গোসলসহ দৈনন্দিন কাজকর্ম করি। এখন পানিতে নামলে গা চুলকায়, গরুগুলোও অস্থির হয়ে যাচ্ছে। নাক মুখ বন্ধ করে পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।

মলি্লকপুর গ্রামের অনুপ তালুকদার বলেন, ধান হারিয়ে নিঃস্ব কৃষক শেষ সম্বল মাছের আশায় বসেছিল। অবশিষ্ট আশাটুকুও তাদের আর রইল না। খাবারের অভাবে তো গরুগুলোকেও দিল ছেড়ে। এখন কি করে বাঁচবে এসব কৃষক এ ভাবনায় দিন যাচ্ছে।

তবে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা দিলীপ সাহা জানান, অকাল বন্যায় পানি চলে আসায় ডিঙ্গাপোতা হাওরের সব কাচা-পাকা ফসল তলিয়ে গেছে। ফলে সেগুলো পানির নিচে পচন ধরে গেছে। এতে এক ধরনের গ্যাসের সৃষ্টি হয়েছে। সৎস্য গবেষকরা পানির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য নমুনা নিয়ে গেছেন। তবে প্রাথমিকভাবে পানির অঙ্েিজন একেবারে মাত্রাতিরিক্ত কম পাওয়া গেছে। যে কারণে অঙ্েিজনের অভাবে মাছগুলো মরে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন বিশাল হাওরে পানি শোধন করারও তেমন ব্যবস্থা নেই। তবে বিশেষজ্ঞ টিম এসেছিলেন। তাদের নিয়ে আমরা হাওর পরিদর্শন করেছি। তারা পরে যে নির্দেশনা দিবেন আমরা সেমতে কাজ করব। ইতোমধ্যে এলাকায় আতঙ্কিত না হতে মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এদিকে, আকস্মিক বন্যায় মৌলভীবাজার জেলার হাকালুকি হাওরের ধান নষ্ট হওয়ার পর মাছ মরে এবার মরছে হাঁস।

স্থানীয়রা বলছেন, ওই এলাকায় দূষিত মরা মাছ খেয়ে মরছে পোষা হাঁস। এতে গরিব কৃষকসহ খামারিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজবাগ এলাকার কামালউদ্দিন গত ১০ বছর ধরে হাঁস পালন করেন। তিনি জানান, এমনটা আগে কখনই ঘটতে দেখেননি তিনি। পানিতে সবখানে মরা হাঁস ভাসছে। তার ১৫০টি হাঁসের সবগুলোই মরে গেছে।

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় হাকালুকি হাওরের পাশের অনেক মানুষের জীবিকা হাওরে হাঁস পালনের ওপর নির্ভরশীল। হাওরে বিচরণ করা এমন শত শত হাঁস মরে হাওরে ভেসে উঠছে।

কুলাউড়া উপজেলা প্রাণিসম্পাদ কর্মকর্তা ডা. সাইফুদ্দিন জানান, হাঁসের মড়ক প্রতিরোধে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। হাওরে চিকিৎসক টিম হাঁসের মধ্যে ভ্যাকসিনসহ ওষুধ প্রদানের কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি হাওরের পানিতে হাঁস না ছাড়ার জন্য খামারিসহ কৃষকদের সচেতনতামূলক পরামর্শ দেয়ার কাজ চলছে।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের প্রধান ড নাসরিন সুলতানাও হাঁস ও মাছের মৃত্যুর জন্য বিষক্রিয়াকেই দায়ী করেছেন। তার মতে ধান পচে এটা হয়েছে।

জামালগঞ্জ : হাওর বেষ্টিত এক ফসলি সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলা। বোরো ফসলের ওপর এ অঞ্চলের কৃষান কৃষানি ও তাদের পরিবারের সব ভরণপোষণের পর পরিবারের বাড়তি কাজ কর্মও নির্ভর করে। জামালগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ হাওরই পানির নিচে তলিয়ে গেছে, শুধু পাকনার হাওরটিই আছে। আর এটিকেই রক্ষা করতে প্রাণপণ লড়ছেন কৃষকরা। একদিকে খড়া, অতিবৃষ্টি, শিলা বৃষ্টি, অকাল বন্যায় কৃষকদের সব সময় উৎকণ্ঠায় সময় পার করতে হচ্ছে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতেও জামালগঞ্জের নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে হাওর পাড়ের সবদিকেই পাড় আর বাধের সমপর্যায়ে রয়েছে।

সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর জন্য যেন 'মরার ওপর খাড়ার ঘাঁ'। তলিয়ে যাওয়া হাওরগুলোর ধান পচে ও মাছ মরার বিকট গন্ধে নদী ও হাওরের পানি দূষণের কবলে পড়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। শাল্লা উপজেলার আননদপুরের বাসিন্দা মিহির জানান, গত চার দিন ধরে শুধু মাছ মরে ভেসে উঠছে, পানির দূষণে বাতাসে দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে।

জানা যায়, সাম্প্রতি সুনামগঞ্জে ছোটবড় ৬০০টি হাওরের কাঁচা আধাপাকা সোনালি ফসল সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে গেছে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোস্তফা মিয়া জানান হাওরের পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যেখানে পানির পিএইচ মাত্রা ৭-এর উপরে থাকার কথা সেখানে ৪.৫ এবং ৪.৪ পাওয়া গেছে।

কিশোরগঞ্জ : আগাম বন্যায় কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে প্রায় অর্ধলক্ষ হেক্টর বোরো জমি তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় লাখখানেক কৃষক। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এখন পর্যন্ত ২১ লাখ ৮ হাজার টাকা এবং ৪৪৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করেছে।

হাওরের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য উল্টে দিয়ে এবার চৈত্রের মধ্যভাগ থেকেই প্রবল বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন এবং নিকলীর বিভিন্ন হাওরের কাঁচা ধান তলিয়ে যেতে থাকে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, তাদের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৪৫ হাজার ৭৭৭ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯৯ হাজার ৩০০ জন কৃষক। তবে জরিপ এখনও চলছে। হিসাব আরও বাড়তেও পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close