logo

ঢাকা, শুক্রবার ৫ ফাল্গুন, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

orangebd logo
হবিগঞ্জে ৪ শিশু হত্যার এক বছর
মামলা শেষ হয়নি ৩ আসামি গ্রেফতার হয়নি আজও
* আতঙ্কে রয়েছে পরিবার * গৃহহীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে বাস
ফয়সল চৌধুরী, সুন্দ্রাটিকি (হবিগঞ্জ)

হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার দুর্গম পল্লী সুন্দ্রাটিকি গ্রামে ৪ শিশু হত্যাকা-ের এক বছর আজ। দ্রুত বিচার আইনে ৩ মাসের মধ্যে বিচার কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এক বছরেও মামলা শেষ হয়নি। কবে শেষ হবে তাও বলা যাচ্ছে না। মামলার ৫৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। তবে শীঘ্রই বিচারকার্য সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন সরকারিপক্ষের আইনজীবী।

এদিকে হত্যাকা-ে জড়িতদের মধ্যে ৩ জনকে পুলিশ এখনও গ্রেফতার করতে না পারায় আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন নিহত ৪ শিশু পরিবার।

যেভাবে খুন করা হয় : গত বছর ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে পার্শ্ববর্তী তাকিয়া গ্রামে খেলা দেখতে যায় সুন্দ্রাটিকি গ্রামের ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র জাকারিয়া শুভ (৮), আবদাল মিয়ার ছেলে প্রথম শ্রেণীর ছাত্র মনির মিয়া (৭), আব্দুল আজিজের ছেলে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র তাজেল মিয়া (১০) ও সুন্দ্রাটিকি আনোয়ারুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসার নুরানি প্রথম শ্রেণীর ছাত্র আব্দুল কাদিরের ছেলে ইসমাইল মিয়া (১০)। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সেদিন খেলা হয়নি। তেমন কেউ মাঠে যায়ওনি। এ সুযোগকেই কাজে লাগায় ঘাতকরা। রাস্তা নীরব হওয়ার সুযোগে তারা ওই শিশুদের বাচ্চু মিয়ার সিএনজি অটোরিকশায় তুলে ফেলে। তাদেরকে অজ্ঞান করে নিয়ে যায় বাচ্চুর গ্যারেজে।

সেখানে তাদেরকে হত্যা করা হয়। রাত গভীর হলে তাদেরকে বস্তায় ভরে অটোরিকশায় করে নিয়ে মাটিচাপা দেয়া হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন জাকারিয়া শুভর বাবা ওয়াহিদ মিয়া। ১৬ ফেব্রুয়ারি থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন নিহত মনির মিয়ার বাবা আব্দাল মিয়া। নিখোঁজের পাঁচদিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে গ্রাম থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরের ইসাবিল নামক স্থান থেকে বালু মিশ্রিত মাটিচাপা অবস্থায় ওই চার শিশুর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।

মামলার বর্তমান অবস্থা : ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্তভার পান ডিবি পুলিশের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মুকতাদির হোসেন। তিনি ৪৮ দিন তদন্ত শেষে গত বছরের ৫ এপিল ৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দেন। এতে অভিযুক্ত করা হয় পঞ্চায়েত সর্দার আব্দুল আলী বাগাল, তার ছেলে জুয়েল মিয়া ও রুবেল মিয়া, ভাতিজা সাহেদ আলী ওরফে সায়েদ, অন্যতম সহযোগী হাবিবুর রহমান আরজু, উস্তার মিয়া, বেলাল মিয়া ও বাবুল মিয়াকে। তাদের মাঝে এখন পর্যন্ত পলাতক রয়েছে উস্তার মিয়া, বেলাল মিয়া ও বাবুল মিয়া। এছাড়া ওই ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতারকৃত সালেহ আহমেদ ও বশির মিয়ার কোন সংশ্লিষ্টতা না পেয়ে মামলা থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়া হয়। আদালত বিভিন্ন কারণে কয়েক দফা চার্জশিট গ্রহণ না করলেও ২৮ জুন চার্জশিট গ্রহণ করে। মামলার সাক্ষীদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৩০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে।

এদিকে ঘটনার ২ দিন পর (১৯ ফেব্রুয়ারি ) নিহত শিশুদের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে সুন্দ্রাটিকি গ্রামে আসেন শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। এ সময় তিনি সংবাদকর্মীদের বলেন, ন্যক্কারজনক এ ঘটনার সঙ্গে যত শক্তিশালীরাই জড়িত থাকুক রাজন হত্যাকারীদের মতো তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এ ব্যাপারে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি এ ধরনের ঘটনা যাতে আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে এজন্য প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ দেন। তিনি আরও বলেন, শিশুদের উদ্ধারে যদি পুলিশের গাফিলতি থাকে তা বরদাশত করা হবে না। তাও তদন্ত করে দেখা হবে। এ সময় তিনি দ্রুত বিচার আইনে ৩ মাসের মধ্যে ঘাতকের বিচার করা হবে বলে জানান। প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণার এক বছরের মধ্যে বিচার সম্পন্ন না হওয়ায় নিহত শিশুদের পরিবারের বিচার নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে সরকারিপক্ষের আইনজীবী (বিশেষ পিপি) বিজন চৌধুরী বলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মামলার রায় দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বিচারক সংকট থাকায় মামলা কার্যক্রম কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে।

কেমন আছে ৪ শিশুর পরিবার : নিহত চার শিশুর পরিবার খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। সরকার প্রতিশ্রুত ঘর নির্মাণের লক্ষ্যে বসতঘর ভেঙে জায়গা খালি করে দিয়ে তারা এ বিড়ম্বনায় পড়েছে। ৬ মাসেও তাদের বসতভিটায় সরকারি ঘর তৈরি না হওয়ায় তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ পরিস্থিতিতে কার্যকর হস্তক্ষেপ চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি যৌথ আবেদন করেছেন নিহত চার শিশুর পরিবার। এ ব্যাপারে নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘরপ্রতি ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এ স্বল্প টাকায় বসতঘর নির্মাণ সম্ভব নয় বিধায় কাজ বন্ধ আছে। হবিগঞ্জ-সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহিলা সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি মানবিক আবেদন করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে নিহত চার শিশুর পৈত্রিক ভিটায় চারখানা বাড়ি ও নিহত শিশুদের স্মরণে সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণীকক্ষ ও লাইব্রেরি নির্মাণ করার নির্দেশনা আসে। পরবর্তীতে ওই বছরের ২১ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ার সুন্দ্রাটিকি শহীদ স্মৃতি পাঠাগার নামের একটি টিনশেড ঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৮ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উপজেলা প্রশাসন শুধু পাঠাগারটি বাস্তবায়ন করে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দেয়া চার শিশুর পরিবারের বসতঘরগুলো নির্মাণ আজও হয়নি।

নিহত শিশুদের পরিবারে সদস্যরা জানান, আজ থেকে মাস ছয়েক আগে নির্বাহী অফিসার আমাদের বাড়িতে এসে নিজে ফিতা দিয়ে বসতঘর মাপামাপি করে অচিরেই প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহার হিসেবে সরকারি খরচে ঘর নির্মাণ হবে বলে পুরাতন ঘরগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী বসতঘর ভেঙে খালি করে দিয়ে পার্শ্ববর্তী স্থানে তাঁবু টাঙ্গিয়ে সবাই বসবাস করছি। নতুন ঘরের আশায় চারটি পরিবারের শিশু-বয়স্কদের নিয়ে তাঁবুতে মানবেতর ও দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন চলে কয়েক মাস ধরে। মাস দুয়েক আগে শুধু ইসমাইলের পিতা আব্দুল কাদিরের ভিটায় ১৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থ একটি ঘরের ৮ ফুট উচ্চতার ইটের দেয়াল ও দুটি লোহার দরজা-জানালা স্থাপন করা হয়েছে। অন্য তিনটি ঘরের এখনও কাজই শুরু হয়নি। তারা আরও জানান, হত্যাকা-ে জড়িত ৩ খুনি পলাতক থাকায় তারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এ অবস্থায় নির্বাহী অফিসারের বরাবর বারবার যোগাযোগ করেও কোন সদুত্তর পাইনি।

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.
close