logo

ঢাকা, শুক্রবার ৫ ফাল্গুন, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

orangebd logo
প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া ঠেকাতে
এটুআই প্রকল্পের দ্বারস্থ মন্ত্রণালয়
রাকিব উদ্দিন

পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে প্রশ্নপত্র ছাপা ও বিতরণের সময় কমিয়ে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তনের চিন্তা-ভাবনা করছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে অভিনব ও নতুন কৌশল খুঁজে বের করতে সরকারের 'অ্যাঙ্সে টু ইনফরমেশন' বা 'এটুআই' প্রকল্পের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বোর্ড কর্মকর্তাদের ধারণা, জেলা ও উপজেলার ট্রেজারি (প্রশ্নপত্র রাখার স্থান) এবং বিজি প্রেসের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণেই বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। এজন্য আগামীতে নিজস্ব প্রিন্টিং প্রেস প্রতিষ্ঠা করারও উদ্যোগ নেয়া হতে পারে। তবে এখনই ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের এক সভায় পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি কৌশল নির্ধারণ করা হয়। এসব বিষয়ে আগামী সপ্তাহে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভা আহ্বানের জন্য প্রস্তাব দেয়া হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। বারবার পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় বেশ বেকায়দায় পড়েছে শিক্ষা প্রশাসন। এজন্য এখন এই নৈরাজ্য বন্ধ করতে নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব শাহেদুল খবির চৌধুরী সংবাদকে বলেন, 'প্রশ্নপত্র তৈরি, ছাপানো, ট্রেজারিতে রাখা ও বিতরণ- এই পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সময় কমিয়ে আনার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। এতে করে প্রশ্নপত্র বেহাত হওয়ার সুযোগ কমবে।'

প্রচলিত পদ্ধতিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড প্রথমে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক দিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এরপর তা মডারেট (সমন্বিত করা) করা হয়, যা সিলগালা করে বিজি প্রেসে (সরকারি ছাপাখানা) পাঠানো হয়। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের কাজ এখানেই শেষ। পরে বিজি প্রেস থেকে তা সংশোধনের পর ছাপানো প্রশ্নপত্র সিলগালা করা হয়, যা ম্যাজিস্ট্রেটরা ট্রাংকে করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ট্রেজারিতে নিয়ে রাখেন। ট্রেজারিতে জমা হওয়ার পর থেকে তা উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি প্রফেসর মাহবুবুর রহমান গতকাল সংবাদকে বলেন, 'প্রশ্নপত্র ফাঁসে সন্দেহের তীর বিজি প্রেসের দিকেই বেশি। ট্রেজারি নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। কারণ প্রশ্নপত্র বিজি প্রেসে জমা দেয়ার পর তা ছাপানো, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পেঁৗছানো, ট্রেজারিতে রাখা ও বিতরণ কার্যক্রমের সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।'

তিনি জানান, 'বোর্ড থেকে বিজি প্রেসে প্রশ্ন দেয়ার পর সেখানেই এর প্রুপ দেখা, সংশোধন এবং চূড়ান্ত করা হয়। এজন্য বিজি প্রেস থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আর এবার ফাঁস হচ্ছে অরিজিন্যাল ছাপানো প্রশ্নপত্র। শিক্ষক বা কেন্দ্র সচিবদের প্রশ্নপত্র দেখার সুযোগ হয় কেবল পরীক্ষা শুরুর এক বা আধা ঘণ্টা আগে। কাজেই শিক্ষক বা বোর্ডের কারও পক্ষেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোন সুযোগ নেই।'

আগের প্রতিবেদন বাস্তবায়নে নিজেদেরই অনীহা : জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত কয়েক বছরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রেক্ষাপটে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে বিভিন্ন সুপারিশ করেছেন তারাই এখন সেগুলো বাস্তবায়নের উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। এজন্য এবার 'এটুআই' প্রকল্প কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। 'এটুআই' প্রকল্পের প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেই আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি পরীক্ষার ইংরেজি ও গণিত (তত্ত্বীয়) দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র হুবহু ফাঁস হয়েছিল। ওই ঘটনা তদন্তে বর্তমান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইনের (ওই সময় অতিরিক্ত সচিব) নেতৃত্বে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল, যা বাস্তবায়ন হয়নি।

প্রতিবেদনে একটি সুপারিশ ছিল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সংশোধন ও প্রশ্ন নির্বাচন একটি নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে করতে হবে। এটি ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারীদের কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে তা 'প্রশ্ন ভা-ারে' রাখা হবে। সেখান থেকে প্রশ্নপত্রের সেট তৈরি হবে। একাধিক প্রশ্ন সেট অনলাইনে পরীক্ষার দিন সকালে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো হবে। এরপর কেন্দ্র থেকে প্রিন্টারে ছাপিয়ে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

এ ব্যাপারে একটি শিক্ষা বোর্ডের সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে বলেন, 'এটি অবাস্তব চিন্তা। কারণ দেশের সব পরীক্ষা কেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ নেই। এতে কোন কারণে একটি কেন্দ্রে প্রশ্ন প্রিন্টারে ছাপানো সম্ভব না হলে, কিংবা কোন অসাধু চক্র ওয়েবসাইট হ্যাক করলে পরীক্ষায় নৈরাজ্য দেখা দিতে পারে।'

২০১৪ সালের তদন্ত কমিটির আরেকটি সুপারিশ ছিল উল্লেখিত পদ্ধতিতে প্রশ্নের সেট করার পর একাধিক সেট সুরক্ষিত ডিভাইসের (যন্ত্র) মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কয়েক দিন আগেই পাঠানো হবে। যন্ত্রটিতে এমনভাবে সময় নির্ধারণ করা থাকবে, যাতে পরীক্ষার দিন সকালের আগে তা খোলা না যায়। পরীক্ষার আগ মুহূর্তে প্রশ্নপত্র নির্ধারিত প্রিন্টারে ছাপিয়ে বিতরণ করা হবে।

এ ব্যাপারে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, 'ওই তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশসহ আধুনিক প্রযুক্তির যাবতীয় বিষয়সমূহ এটুআই প্রকল্পের কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। তারা সব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই বাস্তবতার নিরিখে খুব দ্রুতই একটি প্রতিবেদন দিবেন বলে আশা করছি।'

চলতি এসএসসির গণিত পরীক্ষা গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু আগের দিন রাত থেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে চলতি এসএসসির বাংলা দ্বিতীয়পত্র ও ইংরেজি প্রথমপত্রের পরীক্ষায়ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠে। কয়েক বছর ধরেই এভাবে পাবলিক পরীক্ষা বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠে।

শিক্ষা প্রশাসন এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তদন্ত প্রতিবেদন বাস্তবায়ন হয়নি। প্রশ্নপত্র ফাঁসও ঠেকানো যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন চক্রকে গ্রেফতার করলেও প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হচ্ছে না। সর্বশেষ গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ৬ জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, সিপিইউ, রাউটার, মোবাইল ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়। কলাবাগান থানায় ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলাও হয়।

খবরটি পঠিত হয়েছে ১০১ বার
font
font
সর্বাধিক পঠিত
আজকের ভিউ
পুরোন সংখ্যা
Click Here
সম্পাদক - আলতামাশ কবির । ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক - খন্দকার মুনীরুজ্জামান । ব্যবস্থাপনা সম্পাদক - কাশেম হুমায়ুন ।
সম্পাদক কর্তৃক দি সংবাদ লিমিটেড -এর পক্ষে ৮৭, বিজয়নগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।
কার্যালয় : ৩৬, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০। ফোন : ৯৫৬৭৫৫৭, ৯৫৫৭৩৯১। কমার্শিয়াল ম্যানেজার : ৭১৭০৭৩৮
ফ্যাক্স : ৯৫৫৮৯০০ । ই-মেইল : sangbaddesk@gmail.com
Copyright thedailysangbad © 2017 Developed By : orangebd.com.